সৈনিক


মুহাইমিনুল নাফিউ


স্থান : যশোর ক্যান্টনমেন্ট
সময় : ২৪ জুন, ১৯৭১

আচমকা তীব্র হুইসেলের শব্দে কানে তালা লেগে গেল মুনিরের। সকালের প্যারেডে দাঁড়িয়েই ঝিমুচ্ছিল সে। একে তো উটকো নোটিশ পেয়ে সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে লাহোরে ফেলে এই দূরদেশে আসতে হয়েছে, তার উপর সারারাত ছারপোকার কামড়ে ঘুম হয় নি। এই দূর পরবাসে তার রাতগুলি বিনিদ্র-ই কাটছে এক প্রকার। তাই সকালের পিটি প্যারেডে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল। অবশ্য তার তিন বছরের মিলিটারি জীবনে এটা নতুন কিছু নয়। দ্রুতই সার্জেন্ট এর ধমকে গা ঝেড়ে দিয়ে দাঁড়াল সে। সবার থেকে আলাদা হয়ে প্যারেডের মাঝে ঘুমিয়ে পড়ার শাস্তিস্বরূপ মাঠের চক্কর দিতে শুরু করল। বিয়ের আগে এই চক্কর দেয়ার মতো যন্ত্রনাদায়ক কাজ তার জীবনে আর ছিল না। তবে আজ খুব একটা খারাপ লাগছে না। তার মাথায় ঘুরছে শুধু শায়লার কথা। যত দ্রুত সম্ভব নিজের কাজ শেষ করে ফেরত যেতে চায় সে তার স্ত্রীর কাছে। তবে কাজটা নিয়েই মনটা তার খচখচ করছে এ কয়দিন ধরে। সে ভেবেছিল তাকে ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হবে, কিন্ত এখানে এসে যুদ্ধের কোনো উত্তাপ সে টের পাচ্ছে না। তার উপর তাকে পাঠানো হচ্ছে কোন এক গ্রামে, এখানের কিছুই সে বুঝে উঠছে না ঠিকমতো। হয়তো সেই গ্রামে গেলেই ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে।

মুনিরের দাদা ছিল এই দেশেরই। তবে মুনির বড় হয়েছে লাহোরে, এদেশের প্রতি আলাদা কোনো টান নেই ওর মধ্যে। জন্মের পর কখনো আসেও নি এখানে। এই প্রথম কাজের সূত্রে তার এখানে আসা। তাও আবার যুদ্ধে অংশ নিতে এই দেশের মানুষের বিরুদ্ধেই। তবে এসব নিয়ে খুব একটা ভাবছে না সে। তার চিন্তা যত দ্রুত বাড়ি ফিরতে হবে, তার শায়লার কাছে।

 

স্থান : যশোরের কোন এক অজপাড়া গ্রাম
সময় : ২৫ জুন, ১৯৭১

দুপুরে খাওয়ার পর স্কুলের বারান্দায় হেলান দিয়ে বসে আছে মুনির। সকাল বেলা এই অজপাড়া গ্রামে এসে ক্যাম্প ফেলেছে তারা গ্রামের একমাত্র প্রাইমারি স্কুলে। চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখল। যেখানে বই এর স্তুপ থাকার কথা, সেখানে এখন অস্ত্র সাজিয়ে রাখা সারি করে। বেঞ্চের জায়গা দখল করে নিয়েছে চৌকি। আধখাওয়া সিগারেটটিতে লম্বা করে একটা টান দিল সে। একটু পর বেরুতে হবে, খবর আছে এই এলাকায় প্রায়ই রাতে মুক্তির লোক আসে, ডিঙিবোঝাই অস্ত্রের চালান নিয়ে। এসব অস্ত্র তারা এই গ্রামেরই কিছু মানুষের বাসায় লুকিয়ে রাখে। তাদের কাজ এই অস্ত্র উদ্ধার করা। গ্রামেরই জামিল নামের এক লোক চিনিয়ে দেবে কোথায় যেতে হবে, তাদের কাজ কেবল অস্ত্র জব্দ করা। তবে সেনাদের মাঝে ও একাই নতুন, বাকিরা অনেকদিন ধরেই আছে এদেশে। এসব ভাবতে ভাবতেই চোখ বুজল সে।

বিকাল হতেই মুনির বেরিয়ে পড়ল ওর দলের সাথে। সুবেদারের অধীনে ওরা পাঁচ-ছয়জন সেনা। ওদের দিকে সবাই বেশ অন্যরকম একটা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে টের পেল। অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে চলতে লাগল সে। একটু পরই সে পৌঁছে গেল সিরাজ মুন্সীর বাড়ি। এই জামিল ব্যাটা ঠিকঠাক বলে থাকলে এই বাড়ির পিছনের গোলাঘরেই থাকার কথা অস্ত্রশস্ত্র। দরজায় টোকা দিতে এক তরুণী দরজা খুলে পথ আগলে দাঁড়াল। মুনিরের প্রচণ্ড রকম একটা ধাক্কা লাগল নিজের মনের ভিতর। তরুণীর চেহারা হুবহু শায়লার মতো। সে তরুণীর নাম জিজ্ঞাসা করতে যাবে তার আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে সুবেদার কথা বলতে শুরু করল। মুনির একটু দূরে এসে দাঁড়াল। তার প্রচণ্ড সিগারেটের তেষ্টা পেয়েছে, নিজেকে একবার মনে মনে গালি দিল এই বদভ্যাসের জন্য।

কোনোমতে নিজেকে সামলে তাকাল সুবেদারের দিকে। সুবেদারের জেরায় মেয়েটি সরাসরি জানিয়ে দিল সে কিছু জানে না। সুবেদার তখন মেয়েটিকে বলল তাদেরকে বাড়ির পিছনের গোলাঘরটায় নিয়ে যেতে। মুনির উঁকি দিয়ে দেখল মেয়েটির পিছনে ছোটো দুইটি বাচ্চা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ানো। আর একজন বয়স্ক মহিলা মাথায় কাপড় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরবাড়ি পার হয়ে গোলাঘরে এসে একটু খুঁজতেই অস্ত্রের খোঁজ পাওয়া গেল। জামিলের পান খাওয়া দাঁতের হাসির শব্দকে এড়িয়ে মুনিরের চোখে পড়ল তরুণীর শুকিয়ে যাওয়া মুখ। বেচারি বেশ বড় একটা ধাক্কাই খেয়েছে বলতে হবে। মুনির কী করবে তা ঠিক করবার আগেই দেখল তার সাথের সেনারা মেয়েটাকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।

দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নামার আগেই মোটামুটি সব বাড়ি থেকে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র জব্দ করে ফেলল তার দল। কিন্তু অস্ত্রের চাইতেও যেন বেশি জড়ো করা হয়েছে মানুষ। অল্পবয়সী মেয়েদের একপাশে আলাদা করে রাখা। এক নজরে তাদের মাঝে শায়লার মতো দেখতে মেয়েটাকে দেখতে পেল সে। মুনিরের মন ঠিক সৈনিকদের মতো নয়। শক্ত লোহার টুপি এখনো তার মগজকে চিবিয়ে খায় নি পুরোপুরি। মেয়েটাকে দেখলেই তার মন কেমন যেন উতলা হয়ে উঠছে, না চাইতেও তার কল্পনা মেয়েটার জায়গায় শায়লাকে বসিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটার নাম ও জানা হয় নি তার। চেষ্টা করে সে তার মনোযোগ নিয়ে আসল জড়ো করা যুবক মধ্যবয়স্ক লোকদের দিকে। তাদের অপরাধ মুক্তির লোকদের সহায়তা করা। তবে এদের নিয়ে ঠিক কী করা হবে মুনির বুঝতে পারছে না।

তার চিন্তা বেশি দূর এগোনোর আগেই সুবেদারের আদেশে সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করানো হলো। মুনিরের যেন এক মুহূর্তের জন্য জমে গেল শরীর। সে আড়চোখে তার সহযোগীদের দিকে তাকিয়ে দেখল সেখানে মনুষ্যত্বের শেষ চিহ্নও যেন মুছে গেছে। সুযোগ পেয়ে সবার মনের কোনে লুকিয়ে রাখা পশু সযত্নে পড়ে থাকা ভালোমানুষির মুখোশ ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসছে। সে বাধা দিতে পারল না, চেইন অফ কমান্ডের ভয়, কোর্ট মার্শালের ভয়—তার ভিতরের বিদ্রোহী মনকে আটকে রাখল।

এতদিনের শিখে আসা যুদ্ধনীতি, ন্যায় অন্যায়ের বিচারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদল পশুর সাথে সে নিজেও অংশ নিল এই হত্যাযজ্ঞে। তার সহযোগীরা যখন বেয়নেট দিয়ে লাশ খুচিয়ে বিকৃত আনন্দ উদযাপনে ব্যস্ত, তখন মুনিরের দায়িত্ব পড়ল মেয়েগুলোকে জিপে তোলার। ওদের সাথে কী করা হবে সেটা নিয়ে মুনিরের আর কোনো অনিশ্চয়তা নেই।

ঘড়ির কাঁটা প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই। মুনিরের সহযোগীরা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্ত মনে। মুনিরের চোখে ঘুম নেই, সে একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করে চলেছে। পাশের রুম থেকে এতক্ষণ ভেসে আসা নারী কণ্ঠের চিৎকার তার মনকে বিষিয়ে তুলেছে। রুমের দরজা সামান্য খোলা। সেই দরজার পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে পাহারা দিচ্ছে সে। হঠাৎ সে উঠে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। রুমের ভিতর পুরোটাই অন্ধকার। দিয়াশলাইয়ের আলোয় ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা গুলোর মাঝে খুঁজতে লাগল দুপুরবেলা শায়লার মতো দেখতে মেয়েটাকে। একপাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখল তাকে। বুঝতে পারল যে ওকে এখনো ছোঁয়নি ওর সহযোগীরা।

“এই উঠে আসো তুমি আমার সাথে,” মুনির প্রায় ধমকের সুরেই বলল। মেয়েটা বসে রইল, ওর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। মুনির আর ধমক না দিয়ে হাত ধরে টেনে বাইরে বের করে আনল মেয়েটাকে।

হাতের বাঁধন খুলতে খুলতে মুনির জিজ্ঞাসা করল, “তোমার নাম কী?”

“শিল্পী”, শ্লেষের সাথে বলল মেয়েটি।

“না। এখন থেকে তোমার নাম হচ্ছে শায়লা। তুমি এখন ঝেড়ে এক দৌঁড় দিবে, পিছন ফিরে তাকাবে না গ্রাম থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত। আর কোনো দিন আমার চোখের সামনে পড়বে না।”

শিল্পী এক মুহূর্তের জন্য বুঝে উঠতে পারল না কী হচ্ছে তার সাথে। নিজেকে সামলে নিয়ে কিছু বলে উঠবার আগেই মুনির তার দিকে অস্ত্র তাক করে তীব্র আওয়াজ করে হুইসেল বাজাল। বিপদসংকেতের আওয়াজ এটা, সবাই যেকোন মুহূর্তে ছুটে আসবে। শিল্পী আর কিছু না ভেবে দৌঁড়ে হারিয়ে যেতে লাগল অন্ধকারে। হারিয়ে যাবার আগে একবার পিছনে ফিরে ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যাওয়া এক মূর্তিকে দেখতে পেল, যার পিছনে সার্চলাইট আর হাতে অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে আসছে নিশ্চল মূর্তির সহযোগীরা একে একে।

সে ছুটতে লাগল ধান ক্ষেতের আইল ধরে। পিছনে পড়ে রইল পথহারা জীবনের বেড়াজালে আটকে যাওয়া এক সৈনিক, যে জানে না আর কোনোদিন তার শায়লার দেখা পাবে কি না।

 


মুহাইমিনুল নাফিউ নিজেকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাসের সমুদ্রে ঝড়ে আটকে পড়া, সব হারানো কিন্তু হার না মানা বুড়ো এক নাবিকের মতো মনে করে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top