আসলেই কি চীন হতে যাচ্ছে নব্য ঔপনিবেশিক শক্তি? 

Gavin Coates/eyegambia.org


ম তা ম ত 


সাদিক মাহবুব ইসলাম


নামিবিয়ায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলারের হুসাব ইউরেনিয়াম খনি।

নাইজেরিয়ায় ৮ বিলিয়ন ডলারের হাইস্পিড ট্রেন।

নিকারাগুয়ায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের খাল নেটওয়ার্ক।

জিবুতিতে সামরিক ঘাঁটি।

আর ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্প তো আছেই। 

মাও সে তুংয়ের উত্তরসূরী দেং শিয়াওপিং বলতেন, “তোমার শক্তি লুকিয়ে রেখে অপেক্ষা করো।”

চীন বোধহয় তাঁর কথা মেনেই অনেকদিন অপেক্ষা করেছে। এখন এই অপেক্ষার ফল পেতে পৃথিবীজুড়ে একের পর এক প্রকল্পে হাত দিচ্ছেন চীনের দণ্ডমুণ্ডের প্রধান কর্তা শি জিনপিং। এক আফ্রিকাতেই প্রায় দশ লাখ চীনা কর্মী কাজ করছে। আর পশ্চিমা দুনিয়ায় শোর উঠেছে – চীন নব্য ঔপনিবেশিক শক্তির মত আচরণ করছে।

আসলেই কি তাই?

পশ্চিমারা যাকে ঔপনিবেশিক আচরণ বলে, চীনারা সেটাকেই তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ‘সংহতি’ বোঝাতে ব্যবহার করে। এই সংহতির ধারণা প্রথম নিয়ে এসেছিলেন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান মাও সে তুং। মান্দারিন ভাষায় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রতিশব্দের পয়লা অক্ষর দিয়ে একটা শব্দ বানিয়েছিলেন মাও – ‘ইয়া ফেই লা’।

মাওয়ের এই ‘ইয়া ফেই লা’ সঞ্জীবনী এর প্রথম নজির আফ্রিকাতে দৃশ্যমান হয়েছিল তাঞ্জানিয়া থেকে জাম্বিয়া পর্যন্ত ১১৭৬ মাইল রেলপথ তৈরি করার পর। এর পরের ত্রিশ বছর আফ্রিকাতে তেমন কোনো মেগাপ্রজেক্টে হাত দেয় নি চীন।

একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি হ্রাস পেলেও বৈদেশিক বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ছেদ পড়ে নি এতটুকুও। বরং একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই চীন ব্যাপকভাবে ঋণ প্রদান করা শুরু করে। বর্তমানে চীন বিশ্বের ষষ্ঠ সর্বোচ্চ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান। তাদের আছে ১৩টি আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীন যেন বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানকেই টেক্কা দিতে চাইছে।

তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ঋণ একটা আশীর্বাদ হয়ে আসতে পারে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব চীনের এই কার্যক্রমে খুব একটা তুষ্ট নয়। অনেক অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনা ঋণ আসলে একটা ফাঁদ – যার নাম তারা দিয়েছেন ‘চাইনিজ ডেবট ট্র্যাপ’।

চীনা ঋণের ফাঁদ বলতে পশ্চিমা অর্থনীতিবিদরা যা বোঝান, তার সারার্থ হলো অনেকটা এইরকম: চীন তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোকে প্রচুর পরিমাণে ঋণ দেয়। এরপর দেশগুলো সেই ঋণ শোধ করতে পারে না। তখন দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে আধিপত্য বিস্তার করে চীন।

একইসাথে চীন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিভিন্ন মেগাপ্রজেক্ট তৈরি করে। এরপর সে সকল প্রজেক্ট নির্মাণের জন্য ব্যয়িত অর্থ যখন দেশগুলোকে চীনকে শোধ করতে পারে না, চীন সেসব অবকাঠামো দখল করে নেয়। এসকল প্রজেক্ট যত লোকবল দরকার হয়, তার সিংহভাগ আসে চীন থেকে; কাজেই দেশগুলোর বেকারত্ব দূর হয় না।

চীন যে টাকা দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করে সেটা থেকে বেতন পায় চীনা নাগরিক, অর্থাৎ চীনের টাকা চীনেই ফেরত যায়, সাথে মুফতে চীনা নিয়ন্ত্রণে চলে আসে গুরুত্বপূর্ণ বিদেশী অবকাঠামো। অল্পকথায় এই হলো চীনা ঋণের ফাঁদ। পাশাপাশি সস্তা, নিম্নমানের চীনা পণ্যে সয়লাব দেশগুলোর বাজার; ধ্বংস হয়ে যায় স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা আর বণিকসমাজ। এবং এর লক্ষ্য মূলত দরিদ্র আফ্রিকান দেশসমূহ।

এরকম একজন ব্যক্তি হলেন চীন-গবেষক জাঁ মার্ক ব্লাশার্ড। (কোথায় দিয়েছিলেন বক্তব্যটা) দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন,

“চীনের সাথে বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সাথে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর সাম্রাজ্যবাদী সম্পর্কের মিল আছে। দেশগুলো তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের বিনিময়ে চীনা পণ্য কিনছে। চীন স্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে; চীনের ঋণের চাপে পিষ্ট হচ্ছে দেশগুলো; চীন দেশগুলোর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে প্রাধান্য বিস্তার করছে এবং চীনা নাগরিকরা সেসব দেশে নিজেদের বিলাসী কলোনী বানিয়ে থাকছেন।” 

মি ব্লাশার্ড যেভাবে চীনের ঋণ ফাঁদকে দেখছেন, অধিকাংশ পশ্চিমা অর্থনীতিবিদ ও পলিসিমেকারও চীনের ফরেইন পলিসি নিয়ে একই ধরণের মনোভাব ধারণ করেন। তাও রক্ষা যে ব্লাশার্ড সাহেব অন্তত কবুল করেছেন যে ইউরোপীয়রা যে আচরণ করেছিল উপনিবেশগুলোর সাথে তা নিন্দনীয়! এখন এই পশ্চিমা বয়ানের দুধে কয় আনা পানি আছে, সেটা বিবেচ্য।

তবে বিনা সন্দেহে এটা বলা-ই যায় যে চীনের ঋণদান পলিসি মূলত ওদের জন্য একটা উইন-উইন অবস্থা। ‘চাইনিজ ড্রিম’ আর ‘মহা পুনরজ্জীবন’ এর মতো বিরাট আদর্শ বাস্তবায়নের চেষ্টায় আছে চীন। চীনাদের মতে, এখানে ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর উপকার হয়, চীনের হয় মুনাফা অর্জন। গ্লোবাল সাউথ ডিস্কোর্স-এর উপর নির্ভর করে চলে এই পলিসি।

২০০০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে আফ্রিকার দেশগুলোতে চীন মোট ৯৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে। আফ্রিকার দিকে চীনের নজর মূলত তিনটা কারণে। প্রথমত, আফ্রিকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে চীনের ধীর হয়ে আসা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, আফ্রিকা হতে পারে চীনা পণ্যের বিরাট এক বাজার; এবং তৃতীয়ত, চীন এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং ওয়াশিংটন সমঝোতার বাইরে এসে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার মডেল তৈরি করতে পারে। বলা যেতে পারে, আফ্রিকা হলো চীনের নতুন নতুন অর্থনৈতিক পলিসি ও কূটনৈতিক দক্ষতা প্রদর্শনের পরীক্ষা ক্ষেত্র।

চীন কি আসলেও ঋণের ফাঁদ তৈরি করে?

উত্তরটা খুঁজতে একটু ঘুরে আসা যাক চীনা ঋণের ফাঁদের সবচেয়ে বড় উদাহরণ যেই দেশকে বলা হয়, সেই শ্রীলঙ্কা থেকে। চীনা ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় চীনা বিনিয়োগে তৈরি হাম্বানতোতা গভীর সমুদ্র বন্দর চীনের কাছে ২০১৭ সালে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয় শ্রীলঙ্কা। এর প্রতিবাদে শ্রীলঙ্কাজুড়ে শুরু হয় সহিংস প্রতিবাদ আর আন্দোলন। সমালোচকরা বলছেন, চীন ইচ্ছা করেই ঋণের ফাঁদে ফেলেছে শ্রীলঙ্কাকে যাতে হাম্বানতোতার বন্দরে নৌঘাঁটি স্থাপন করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা কি আসলেই তাই?

তথ্য-উপাত্ত ঘাটলে বোঝা যায়, ঘটনাটি মোটেই এরকম নয়। ২০০২ সাল থেকেই শ্রীলঙ্কা একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে চাইছিল। সেজন্য প্রথমে ভারত ও জাপানের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়। কিন্তু এই দুই দেশের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় চীনের দ্বারস্থ হয় শ্রীলঙ্কা।

(কয় বছর ধরে নির্মাণ কাজ চলে/কবে ঋণ পায়) নির্মাণ শেষে ২০১০ সালে উদ্বোধনের পর দেখা যায়, লাভজনক হয় নি বন্দরটি। এরপর তাই হাম্বানতোতা বন্দরের ৭০% লিজ নেয় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিএমপোর্ট। তবে চীন শ্রীলঙ্কায় ঔপনিবেশিক আচরণ করছে, এমন অভিযোগ প্রথম উঠে ২০১৪ সালে। সেই বছর বন্দরে দুটি চাইনিজ নৌজাহাজ নোঙর ফেললে চীন এখানে নৌঘাঁটি স্থাপন করতে চায় — এমন অভিযোগ এনে তীব্র প্রতিবাদ করে ভারত। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে বোঝা যায়, বাস্তবে এটা ছিল শুভেচ্ছা সফর। এর আগে ২০১৩ সালে বিভিন্ন দেশের ২৩০টি নৌজাহাজ শ্রীলঙ্কায় শুভেচ্ছা সফরে এসেছিল।

অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার মোট বৈদেশিক ঋণ ৬৫ বিলিয়ন ডলার; যার মাঝে মাত্র ৮ বিলিয়ন ডলার হলো চীনা ঋণ। এই ঋণের পরিমাণও এত বেশি হতো না। হয়েছে, কারণ চীনা ঋণে সুদের হার অনেক বেশি। শ্রীলঙ্কা পশ্চিমা দাতাদের কাছে চীনার চাইতেও অনেক বেশি ঋণী। (কবে গৃহযুদ্ধ হয়েছিল) গৃহযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে দেশটির এই ঋণের অনেক প্রয়োজন ছিল।

শুধু পশ্চিমের কথা না শুনে একটু গবেষণা করে দেখলে চীন কেন্দ্রিক এই শোরগোল অনেকটাই অমূলক মনে হয়। চীন কেমন করে নয়া ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে, সেই কথা অনেক শোনা গেলেও পশ্চিমা মিডিয়াতে কখনোই শোনা যায় না কীভাবে চীন কিউবার ২.৮ মিলিয়ন ডলার, বতসোয়ানার ৭ মিলিয়ন ডলার আর জিম্বাবুয়ের ৪০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ মওকুফ করে দিয়েছিল।

প্রায়ই বলা হয়ে থাকে, চীন অন্যান্য দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের চেষ্টা করে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে। অনেকেই দাবি করেন যে চীন আসলে ঋণ দেয়-ই এই উদ্দেশ্যে যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সেই দেশটির প্রাকৃতিক সম্পদ কব্জা করবে তারা। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চীনের ঋণ লাতিন আমেরিকায় দেয়া মোট ঋণের অর্ধেক, আর আফ্রিকায় সেটা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। বরং, ষাট কোটি আফ্রিকান যেখানে অন্ধকারে বাস করে, সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনা ঋণের ৪০% ব্যয় হয়। ৩০% ঋণ ব্যয়িত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে।

চীনের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় অভিযোগ হলো চীনা নাগরিকরাই নাকি চীনের সাহায্য নেয়া সব মেগাপ্রজেক্টে কাজ করে। এর ফলে ঋণগ্রহীতা দেশসমূহে তেমন কোনো কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় না। কিন্তু জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেবোরাহ ব্রাউটিগাম তার একটি গবেষণায় দেখান যে, চীনের সাহায্যে শুরু হওয়া প্রজেক্টের শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র ৩০% চীনা নাগরিক। তবে এর ব্যতিক্রম দেখা যায় নামিবিয়ায়। চীনা নাগরিকদের কাজ করার হার নামিবিয়াতে বেশি, যা নামিবিয়াতে বেশ সমস্যারও সৃষ্টি করেছে।

আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই বলে থাকে, চীনা পণ্যের কারণে আফ্রিকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; তাদের স্থানীয় শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এই অভিযোগ মিথ্যা নয়। দামে সস্তা এবং ভাবে চটকদার চীনা পণ্য সারা পৃথিবীর অনেক দেশেই নানা স্থানীয় শিল্প ধ্বংসের কারণ।

তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধ্বজাধারী আইএমএফ বা বিশ্বব্যাঙ্কের কাছ থেকে এই কথা শোনাটা ভূতের মুখে রাম রাম-ই বলে মনে হয়!

তাহলে কি চীনা বিনিয়োগ মানে কেবলই অবিমিশ্র আশীর্বাদ?

না, সেটাও না।

জাম্বিয়াতে দেখা যায়, চীনা লবিস্টরা দেশটির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাতকে কব্জা করে ফেলেছে। এদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট মাইকেল সাটা অসহায় ছিলেন। সেখানে চীনা কতৃত্ব এমনই বাজে অবস্থায় চলে গিয়েছিল যে জাম্বিয়ার বিরোধী দল চীনা ব্যবসায়ীদের নব্য-ঔপনিবেশিক শক্তি বলে অবহিত করেছিলেন।

সুদানের দারফুর অঞ্চলে চলেছে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ। এই মানবিক বিপর্যয়ে চীন নিয়েছিল সুদানি সরকারের পক্ষ। সস্তায় সুদানি তেলের বিনিময়ে চীন সুদানের বিরুদ্ধে নেয়া জাতিসংঘের একের পর এক পদক্ষেপ নস্যাৎ করে দিয়েছিল। সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের স্বৈরাচার ফ্রাসোয়াঁ বোজিজের সরকারের সাথে ২০০৩ সালে খনিজ সম্পদ ও টেলিকমিউনিকেশন খাতে বিপুল বিনিয়োগ চুক্তি করে, যা স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। একইসাথে চীন আফ্রিকার দেশগুলোকে প্রত্যক্ষভাবে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে চাপ দেয়, যা মূলত ‘এক-চীন নীতি’ এর বহিঃপ্রকাশ।

আফ্রিকার অনেক দেশেই চলে স্বৈরাচারী শাসন। এই দেশগুলোর স্বৈরাচারী শাসক চীনা বিনিয়োগের লাভকে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করার কাজে ব্যবহার করে। একই সাথে আফ্রিকার স্থানীয় শাসকরা চীনা ঋণ ও বিনিয়োগকে তাদের নিজেদের গোত্র বা দলের লোকদের মধ্যে ভাগ করে দেন। এর ফলে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছায় না এর সুফল।

আবার ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের অধীনে চীন বেশ কিছু বির্তকিত প্রকল্প হাতে নেয়। যেমন: ১২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ ইউরোপ-চায়না রেলওয়ে তেমন কোনো লাভের মুখ দেখে নি। ফিরতি পথে ট্রেনের মাত্র ৪৫% পূর্ণ থাকে। এর ফলে চীনকে প্রতি কন্টেইনারে এক থেকে সাত হাজার ডলার ভর্তুকি দিতে হয়।

৩.২ বিলিয়ন ডলারে নির্মিত কেনিয়ান রেলওয়ে প্রজেক্টও একেবারেই লাভের মুখ দেখে নি। ইথিওপিয়ান রেলওয়ে বানাতে চীনের ব্যয় হয়েছিল সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার; সেটা এতই লোকসানের শিকার হয়েছে যে চীনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি সিনোশিওরের এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে।

বাষট্টি বিলিয়ন ডলারের চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘করিডোর টু নোহোয়্যার’। গোয়াদরে বানানো নৌবন্দরে এমন কোনো কার্যক্রম হয় না। ছয় বছর ধরে সেখানকার বিমানবন্দরের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। এর ওপর তানজানিয়া দশ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণের প্রকল্প বাতিল করে দেয়, বাংলাদেশও সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রকল্প বাতিল করে দেয়। নেপাল দুটো বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প বাতিল করে; সিয়েরা লিয়ন বাতিল করে মামামাহ শহরে নির্মাণাধীন বিমানবন্দরের কাজ; কেনিয়া ২.৬ বিলিয়ন ডলারের হাইওয়ে নির্মাণের প্রকল্প বাতিল করে আর মায়ানমার কিয়াউকপিউ বন্দরের বার্থ কমিয়ে আনে, ফলে প্রকল্প ব্যয় হয়ে যায় ছয়ভাগের একভাগ।

এ সকল কারণে চীনার গ্র্যান্ড প্ল্যান অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু, এখানে পুরোটা দায় চীনেরও না। অনেকক্ষেত্রেই ঋণগ্রহীতা দেশ নানা কিছু করতে অনিচ্ছুক থাকে। আর অনেক সময় দেশগুলো তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করে না, ফলে ক্ষতির মুখ দেখে প্রকল্পগুলো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পুনর্গঠনের জন্য মার্শাল প্ল্যান গ্রহণ করেছিল। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সেই প্ল্যানের চাইতেও বিশাল। এখন চীন পশ্চিমা দাতাগোষ্ঠীর মনোপলিতে ভাগ বসিয়েছে। চীন বিশ্বাস করে, বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়া তাদের অধিকার, এবং তারা সেটা করেই ছাড়বে।

পশ্চিমারা চীনকে থামাতে চাইলে এসব গৎবাঁধা প্রপাগান্ডার বাইরে বেরিয়ে এসে বাস্তবিকভাবেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য সহজশর্তে কার্যকর ঋণ প্রদান করতে হবে। পশ্চিমা দেশগুলো যাই বলুক না কেন, তারা যেভাবে চীনকে নব্য ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে দেখাতে চায়, চীন কোনোভাবেই তা নয়।

চীনকে প্রতিহত করতে হলে প্রয়োজন যথার্থ পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন। পশ্চিমা প্রভাব থেকে মুক্ত অনেক বিশেষজ্ঞ-ই বলছেন, উইঘুরদের ওপর চালানো বর্বর নির্যাতন, হংকং-এ দমনপীড়ন অথবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মত ইস্যুগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে; অর্থনীতির সাথে এসব মানবিক বিষয়ে মিলিয়ে ফেললে দুটোর একটার উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হবে না।

আর তাছাড়া সাবেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের কাছে এমন গালভরা নীতিবাক্য শোনা অত্যন্ত দুঃখজনক — চীন তো আর তাদের মতো আফিম ব্যবসায় বাধা দেওয়ার যুদ্ধ বাধিয়ে দিচ্ছে না!

 


সূত্র:

  1. ভারত মহাসাগর ভারত-চীন দ্বন্দ্ব: তারেক শামসুর রেহমান
  2. Ameyaw-Brobbey, Thomas. 2020. “Hegemonic Theory is Not Dead: Regime Survival and Premature Hegemonic War – Impact of China’s Economic Rise on the International System”. JOURNAL OF GLOBAL PEACE AND CONFLICT 8 (1). doi:10.15640/jgpc.v8n1a2.
  3. Cai, Kevin G. 2018. “The One Belt One Road and the Asian Infrastructure Investment Bank: Beijing’S New Strategy of Geoeconomics and Geopolitics”. Journal of Contemporary China 27 (114): 831-847. doi:10.1080/10670564.2018.1488101.
  4. “China is at Risk of Becoming a Colonialist Power”. 2021. Ft.Com. ft.com/content/186743b8-bb25-11e8-94b2-17176fbf93f5
  5. “China May Be a Lot of Things in Africa, But It’s NOT a Coloniser”. 2021. Medium. medium.com/@eolander/china-may-be-a-lot-of-things-in-africa-but-its-not-a-colonizer-628285cda6a0
  6. “Debunking the Myth of ‘Debt-Trap Diplomacy’”. 2021. Chatham House – International Affairs Think Tank. chathamhouse.org/2020/08/debunking-myth-debt-trap-diplomacy
  7. Diebold, William, and Richard W. Lombardi. 1985. “Debt Trap: Rethinking the Logic of Development”. Foreign Affairs 64 (1): 178. doi:10.2307/20042499.
  8. Diplomat. 2021. “Is China a New Colonial Power?” thediplomat.com thediplomat.com/2020/11/is-china-a-new-colonial-power/
  9. Haiquan, Liu. 2017. “The Security Challenges of the “One Belt, One Road” Initiative and China’s Choices” Croatian International Relations Review 23 (78): 129-147. doi:10.1515/cirr-2017-0010.
  10. “Is China the World’S New Colonial Power? (Published 2017)”. 2021. Nytimes.com nytimes.com/2017/05/02/magazine/is-china-the-worlds-new-colonial-power.html
  11. Lumumba-Kasongo, Tukumbi. 2011. “China-Africa Relations: A Neo-Imperialism or a Neo-Colonialism? A Reflection*”. African and Asian Studies 10 (2-3): 234-266. doi:10.1163/156921011×587040
  12. Singh, Ajit. 2020. “The Myth of ‘Debt-Trap Diplomacy’ and Realities of Chinese Development Finance”. Third World Quarterly 42 (2): 239-253. doi:10.1080/01436597.2020.1807318.
  13. Singh, Ajit. 2020. “The Myth of ‘Debt-Trap Diplomacy’ and Realities of Chinese Development Finance”. Third World Quarterly 42 (2): 239-253. doi:10.1080/01436597.2020.1807318.
  14. “Why Are Westerners So Keen on Calling China a Colonial Power?”. 2021. South China Morning Post. scmp.com/comment/opinion/article/3110253/why-are-westerners-so-keen-calling-china-colonial-power

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top