‘কন্ট্রাক্ট’ ওয়েব সিরিজ: একটি দারুণ সম্ভাবনাময় গল্পের হতাশাজনক চিত্রায়ণ


আ লো চ না – সি রি জ


তানজিনা তাবাস্‌সুম নোভা


বাংলাদেশের থ্রিলারপ্রেমী পাঠকদের কাছে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন একটি সুপরিচিত নাম। তাঁর রচিত জনপ্রিয় বেগ-বাস্টার্ড  সিরিজের দ্বিতীয় বই কন্ট্রাক্ট  অবলম্বনে ওয়েব সিরিজ নির্মাণের খবরে তাই আমার মতো অনেক পাঠকই দুর্দান্ত একটি থ্রিলার পর্দায় দেখার আশা করছিলেন। তো, তানিম নূর ও কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত এই সিরিজ দর্শক ও পাঠকদের প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু সফল?

অমূল্য বাবুর (জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়) বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ব্ল্যাক রঞ্জু (চঞ্চল চৌধুরী) গা ঢাকা দিতে বাধ্য হলেও সে প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করে। বাস্টার্ড নামে যে কিশোর সে সময় অমূল্যর জীবন বাঁচায়, বহু বছর পর অমূল্য তাকেই (আরিফিন শুভ) ব্ল্যাক রঞ্জুকে শেষ করে দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন। পেশাদার কন্ট্রাক্ট কিলার বাস্টার্ড এরপর রঞ্জুকে খুঁজে বের করার মিশনে নামে।

শুরুতেই আসা যাক সিরিজটির ইতিবাচক দিকগুলোর বেলায়। সব মিলিয়ে এই সিরিজের নির্মাণ ও পরিচালনা বেশ ভালো।

সিরিজের অন্যতম প্রশংসনীয় দিক হলো শিল্পীদের অভিনয়। যাঁর অভিনয় নিয়ে সিরিজ দেখার আগে অনেকের মনে সংশয় ছিল, সেই আরিফিন শুভ বাস্টার্ড চরিত্রে চমৎকার মানিয়ে গেছেন। অল্প কয়েকটি জায়গায় তাঁর অভিব্যক্তি বা সংলাপ প্রক্ষেপণ যথাযথ মনে হয় নি, তবে বাকি জায়গাগুলোতে তিনি ভালোভাবেই উতরে গেছেন। মাফিয়া বস ব্ল্যাক রঞ্জু চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী বরাবরের মতোই লা-জওয়াব। হোমিসাইড ইনভেস্টিগেটর জেফরি বেগ চরিত্রে শ্যামল মাওলাও তাঁর যতটুকু সুযোগ ছিল তার মধ্যেই নিজের সেরাটা দেখিয়েছেন। মিনা চরিত্রে জাকিয়া বারী মম ও ছিলেন দুর্দান্ত। এছাড়াও, ছোট ছোট চরিত্রে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, তারিক আনাম খান, রওনক হাসান, সমু চৌধুরী, মাজনুন মিজান— সবাই-ই ভালো করেছেন। একমাত্র রাফিয়াত রশিদ মিথিলার অভিব্যক্তি পুরোটা সময় জুড়েই খুব বেশি নিষ্প্রাণ লেগেছে।

আরেকটি ভালো দিক হলো সংলাপ। “ওস্তাদের মাইর মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলায়ও খাইতে হয়” কিংবা “আমি কিন্তু সবগুলা গাজীরে শহিদ বানাইয়া ছাইড়া দিমু” এ ধরনের বেশ কিছু সংলাপ এই সিরিজে ব্যবহৃত হয়েছে যেগুলো শুনে দর্শক ভালোই বিনোদিত হবেন।          

খারাপ দিকের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় এই সিরিজে যথেষ্ট পরিমাণে প্লট হোল রয়ে গেছে। পুরো সিরিজ জুড়ে অনেক ঘটনা ঘটেছে, যার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় নি। সিরিজের দ্বিতীয় সিজন আসার কথা শোনা যাচ্ছে, সেক্ষেত্রে প্রথম সিজনের শেষে কিছু বিষয় অমীমাংসিত থাকতেই পারে, কিন্তু সেগুলো এমন খাপছাড়া ভাবে না হলে, আর পরিমাণে এত বেশি না হলেই ভালো হতো। অনেক দর্শকই হয়তো আমার সাথে একমত হবেন যে, আরো দুই একটি এপিসোড বাড়াতে পারলে হয়তো এই সিজনের সমাপ্তিটা আরো ভালোভাবে টানা যেত।

অ্যাকশন দৃশ্যগুলো নিয়েও আমার মতো অনেক দর্শকের আপত্তি থাকার কথা। বাস্টার্ড যখন ঘাড় মটকে কাউকে মেরে ফেলছে, সে দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে যে, সে অন্য ব্যক্তিটির ঘাড়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। বাস্তবে কারো পক্ষে এত মোলায়েমভাবে ঘাড় মটকে কাউকে মেরে ফেলা সম্ভব না। কিংবা, সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল দিয়ে গুলি করে কাউকে মেরে ফেললে বাস্তবসম্মতভাবেই গুলির শব্দ হবে না, এতটুকু ঠিক আছে। কিন্তু সেই গুলি খেয়ে যে মারা যাচ্ছে, সে-ও কেন নিঃশব্দে মারা যাচ্ছে, এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। তার মুখে তো সাইলেন্সার লাগানো হয় নি, তাই না?

আর্টসেল-এর অনিকেত প্রান্তর, বাংলা ফাইভ এর কনফিউশন — দুটোই দারুণ গান। কিন্তু, এই সিরিজে এই গান দুটো ব্যবহার করার কারণটা আমার কাছে ঠিক পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে অনিকেত প্রান্তর  গানটি গল্পের যে পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়েছে, তার সাথে গানটির কোনো মিল ই নেই।

এবার কন্ট্রাক্ট  বইটির একজন পাঠক হিসেবে কন্ট্রাক্ট  সিরিজটি নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই। প্রথমে এক বাক্যে বলে নিই, আমি হতাশ। মূল গল্পের লেখক মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন এক সাক্ষাৎকারে বইয়ের গল্পের সাথে সিরিজের গল্পের মিল না খোঁজার কথা বলেছেন। একটা বইয়ের গল্পকে পর্দায় আনতে গেলে গল্পটা দরকারমতো পরিবর্তন করার স্বাধীনতা একজন নির্মাতার থাকে, কিন্তু তাই বলে মূল গল্পের প্রায় ৭০-৮০% কোনো নির্মাতা পাল্টে ফেলতে পারেন না।

যারা বইটা পড়েছেন, সবাই জানেন যে, বইয়ে ব্ল্যাক রঞ্জু একটি রহস্যময় চরিত্র হিসেবে থাকে, সে দেখতে কেমন, কোথায় থাকে—এসব খবর পুলিশ তো দূরের কথা, তার নিজের দলের বেশিরভাগ লোক পর্যন্ত জানে না। গল্পটা ব্ল্যাক রঞ্জুকে খোঁজা নিয়ে আবর্তিত হলেও তার দেখা পাওয়া যায় গল্পের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে। সেখানে এই সিরিজে শুরু থেকে ব্ল্যাক রঞ্জুকেই গল্পের কেন্দ্র বানিয়ে ফেলা হয়েছে। তাতে করে এই চরিত্রটি নিয়ে কোনো রহস্যই আর থাকল না। চঞ্চল চৌধুরীর মতো একজন অভিনেতাকে কোনো চরিত্রে নিলে তাঁকে যথেষ্ট পরিমাণ স্ক্রিনটাইম দিতে হবে; কিন্তু সেই স্ক্রিনটাইম দিতে গিয়ে মূল গল্পের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক পাল্টে ফেলাটা পাঠকদের অসন্তুষ্ট করেছে।

বইয়ের গল্পে ব্ল্যাক রঞ্জু কলকাতা শহরে আত্মগোপনে থাকে, আর তাকে খুঁজতে খুঁজতে বাস্টার্ড সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়। সিরিজে এই বিষয়টি একেবারেই ছিল না। বাংলাদেশের মধ্যেই তার এই আত্মগোপন করে থাকার বিষয়টি দেখানো হয়তো অসম্ভব ছিল না, কিন্তু নির্মাতারা সেদিকে যান নি।

বইয়ের অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সিরিজে অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। আমার সেটা নিয়ে কোনো আপত্তি থাকত না, যদি না বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রকে সিরিজে একেবারেই কম গুরুত্ব দেওয়া হতো। বেগ-বাস্টার্ড সিরিজের মুখ্য বিষয়টিই হলো হোমিসাইড ইনভেস্টিগেটর জেফরি বেগ আর কন্ট্রাক্ট কিলার বাস্টার্ড এর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেখানে এই সিরিজে জেফরি বেগকে ঠিকমতো দেখানো-ই হয় নি। তাকে যে কোনো একজন সাধারণ পুলিশ সদস্যের মতোই বানিয়ে ফেলা হয়েছে। একই কারণে জেফরি আর বাস্টার্ডের মধ্যকার ইঁদুর-বেড়াল খেলার দৃশ্যগুলোও সিরিজে অনুপস্থিত ছিল। জেফরি বেগের চরিত্রকে এতটাই কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, সিরিজের পোস্টারে পর্যন্ত তাকে রাখা হয় নি। যারা বইটি পড়েছেন, তাদের পক্ষে এই ব্যাপারটি মানা সহজ নয়।

বাস্টার্ডের নাম কেন বাস্টার্ড, কখন, কীভাবে অমূল্য বাবু তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন—এসব বইয়ের পাঠকেরা জানেন। কীভাবে বাস্টার্ড একজন পেশাদার খুনি হয়ে উঠলো, তা-ও জানেন। কিন্তু সিরিজে এ বিষয়গুলো একেবারেই দেখানো হয় নি। ফলে, যেসব দর্শক বই না পড়ে সিরিজ দেখতে বসবেন, তাদের মনে এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক।

মোট কথা, যেসব দর্শক আগে থেকে বইটি পড়েন নি, তাদের জন্য কন্ট্রাক্ট একটি মোটামুটি উপভোগ্য থ্রিলার হতে পারে। আর যারা বইটি আগেই পড়ে ফেলেছেন, তাদের সিরিজটি উপভোগ করার জন্য বইয়ের গল্প ভুলে গিয়ে নতুন একটি গল্প হিসেবে সিরিজটি দেখতে বসতে হবে।

 


লেখক টিডিএ এডিটোরিয়াল টিমের একজন সদস্য। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top