বাংলাদেশে একটা নতুন ব্যান্ডের টিকে থাকা অনেক কঠিন: আরেকটা রক ব্যান্ড


আরেকটা রক ব্যান্ডের সাথে কথোপকথন


অনিন্দ্য আরিফ, রাহিন আমিন, জুয়াইরিয়া হক


সামনাসামনি যাওয়ার উপায় নেই, তাই জুম মিটিং-ই সই। আরেকটা রক ব্যান্ড-এর  রিয়াসাত আযমীর সাথে আমাদের ইন্টারভিউ শুরু হওয়ার কথা রাত ৯টায়। জুম অ্যাপে কীভাবে মিটিং রেকর্ড করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করতে করতে কেটে গেল বিশ মিনিট। অবশেষে যখন ইন্টারভিউ শুরু হলো, তখন ঘড়ির কাটায় রাত ৯টা বেজে ৩৫ মিনিট। 

ক্যামেরায় দেখা গেল ঘর অন্ধকার। এসেই রিয়াসাত জানালেন, শুধু তিনি নয়, একই ঘরে আছেন আরেকটা রক ব্যান্ড-এর গিটারিস্ট সাকিব মঞ্জুর জিহান এবং কনক্লুশন ব্যান্ডের গিটারিস্ট জাকির হোসেনও। লকডাউনে তিন বন্ধু চলে এসেছেন এক জায়গায়। আড্ডা দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। 

তাতে আখেরে অবশ্য আমাদেরই লাভ হয়েছে। দ্য ঢাকা অ্যাপোলগের সাথে আরেকটা রক ব্যান্ডের আড্ডা শুধু আরেকটা রক ব্যান্ড-এর গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল এই দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি, নতুনদের গান বানানোর পেছনের ফিলোসফি পর্যন্ত। আমরাও শুরুতেই বলে নিলাম, আমরা শুধুই আরেকটা রক ব্যান্ডের গান নিয়ে প্রশ্ন করতে একদমই রাজি নই। কনক্লুশন বেশি দর্শকপ্রিয় নাকি আরেকটা রক ব্যান্ড, প্রশ্ন করতে চাই এসব নিয়েও। 

রাহিন: রিয়াসাত ভাই, আরেকটা রক ব্যান্ড হিসেবে কাজ করছেন প্রায় দুই বছর হয়ে গেল। আপনাদের প্রথম রিলিজ বোধহয় দুই বছর আগে জুলাইতে ছিল। এই যে এই দুই বছরে পথচলা, এটাকে কীভাবে দেখেন?  

কী পেতে চেয়েছিলেন, কী পেয়েছেন, কী পাওয়া এখনো বাকি?  

রিয়াসাত: সত্যি বলতে, আমাদের এই পথচলাটা অনেক অপ্রত্যাশিত ছিল। অনেক কিছুই হয়েছে যা আমরা কখনোই ভাবি নাই। আমরা তো শুধু সপ্তাহে একদিন বসে একটু জ্যাম-ট্যাম করব, এরকম ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু এই সময়েই মধ্যেই মানুষের এত ভালোবাসা পাব, এটা কল্পনাও করি নাই। সেদিক থেকে দেখলে, যা-ই হয়েছে, যতটুকু-ই হয়েছে, আমরা খুবই হ্যাপি। আমরা নিজেরা মানুষ হিসেবে বড় হয়েছি, ব্যান্ড হিসেবে বড় হচ্ছি, আমরা এতেই খুশি। 

 

অনিন্দ্য: লকডাউনে কেমন দিন কাটাচ্ছেন? ব্যান্ড হিসেবে কী কী করছেন? 

রিয়াসাত: গত বছরও লকডাউনের শুরুতে আমরা তেমন কিছু করি নাই। নিজেদেরকে সময় দিয়েছি। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার পর কাজে ফেরা শুরু করলাম। “চাপ” গানটি রিলিজ দিয়েছি, কিছু শো করলাম। এখন আবার লকডাউনে। আবারো ভাবছি একটু নিজেদেরকেই সময় দিব। 

এরপর জিহানের দিকে ঘুরে, “কী জিহান?” এরপর দুজন মিলেই হেসে দিলেন।

দেখা যাক পরিস্থিতি কোনদিকে যায়।  

রাহিন: মাত্র পাঁচটা গান বের হয়েছে আপনাদের, কিন্তু প্রতিটা গানেরই আলাদা স্টাইল, আলাদা জনরা…

রিয়াসাত: কোন গান কোন জনরার হবে, সেটা আসলে আমরা আলাদাভাবে চিন্তা করি না।  একটা প্রাথমিক ধারণা থাকে আমাদের মাথায়, যে হয়ত রাগী গান হবে, ভালো মুডের গান হবে অথবা নাচানাচি করা যায় এমন গান হবে। যখন যেটা মাথায় আসে, সেভাবেই কাজ করি। জনরার ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যত দিন যাবে, জনরা ব্যাপারটা ততটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাবে। জনরার যেই সীমারেখাগুলো আছে, সেগুলো অনেকটাই ছোট হয়ে আসছে।  

জিহান: অ্যালবাম বানানোর প্ল্যান আমাদের কখনোই ছিল না। সবসময়ই আমরা আলাদা আলাদা সিঙ্গেল গান করতে চেয়েছি, যাতে একই ধরনের সাউন্ডের মধ্যে আটকে থাকতে না হয়। যেভাবে ভালো লেগেছি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। এই স্বাধীনতাটা আমাদের ছিল। সময় যাচ্ছে, আমাদের ব্যান্ডের সাউন্ড কেমন হবে, সেটা আমরা আস্তে ধীরে টের পাচ্ছি। আগে আমরা একটা স্টুডিও ব্যান্ড ছিলাম, এখন আমরা অন্যভাবে কাজ করি। 

রিয়াসাত: আমার মনে হয় এখন থেকে আমাদের গানের ধরণ ‘চাপ’ গানটির মতোই হবে। দেখা যাক। 

 

অনিন্দ্য: রাশা ভাই বাদে আপনাদের ব্যান্ডের কেউ প্রফেশনালি মিউজিক নিয়ে কাজ করেন না। এর কারণ কী? 

পেশাদার শিল্পী হিসেবে টিকে থাকা কি খুবই কঠিন? নাকি আপনারা ব্যান্ড হিসেবে আরেকটু দাঁড়ানোর পরে সেটা করতে চান?

রিয়াসাত: রাশা একজন মিউজিক ডিরেক্টর। সে বাদে আমরা সবাই গান ভালোবাসি দেখে গানবাজনা করি। এটা আমাদেরকে খুশি রাখে দেখে করি। এছাড়াও আমরা যেই ঘরানার গানবাজনা করি, বাংলাদেশে সেই ধরনের গানের শ্রোতা কিন্তু খুব বেশি না। 

আসলে এটা আমাদের সবগুলো আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যান্ডের ক্ষেত্রেই সত্যি। আমাদের সবার অডিয়েন্সই খুব ছোট। আর শ্রোতার সংখ্যা যদি কম থাকে, তাহলে তো গানবাজনা করে যত যাই হোক আমরা টাকা কামাতে পারব না। এখন তো সব ভিউ কাউন্টের উপরেই নির্ভর করে। আর টাকা কামাতে না পারলে তো আমাদের পেশাদার শিল্পী হিসেবে কাজ করাও সম্ভব না। এটা খুবই দুঃখজনক। কিন্তু কিছু করার নেই। 

তাই আমরা মিউজিকটাকে সেভাবেই দেখি। আমাদের ভালো লাগে দেখে করি। অন্য কোনো চিন্তা করা লাগবে না, শুধু গান বানিয়েই টাকা কামাব, এটা একটা প্রিভিলেজ। 

 

রাহিন: এই যে আপনাদের সবারই গান বাদেও অন্য একটা ক্যারিয়ার আছে, এটা তো আপনাদের একটা সুবিধা। টাকার জন্য আপনাদের গানের উপর নির্ভর করতে হয় না। কিন্তু নতুন যারা শুধু গান নিয়েই কাজ করতে চায় পেশাদারভাবে, তাদের আর্থিকভাবে টিকে থাকা আসলে কতটুকু কঠিন? 

রিয়াসাত: অনেক বেশি কঠিন। বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিককে তো আমরা একটা ইন্ডাস্ট্রি বলতে পারব না। বাইরের দেশে যদি আমরা কেবল রক মিউজিকটাকেই দেখি, পপ-টপ বাদ দিলাম, গানের উপর নির্ভর করে পুরো একটি ইন্ডাস্ট্রি থাকে। 

একটা ইন্ডাস্ট্রি থাকা মানে কী? মানুষ ইনভেস্ট করছে, টাকা-পয়সা আসছে, যার কারণে ঐ ইন্ডাস্ট্রির উপর ভিত্তি করে অনেকে অনেক কিছু করতে পারে। নতুন নতুন চাকরি তৈরি হয়। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত গানবাজনার এমন কোনো অবকাঠামো নাই, অন্তত ব্যান্ড মিউজিকের ক্ষেত্রে এখনো হয় নি।

সমস্যা যেটা হয়, ইনডাস্ট্রি না থাকার কারণে এদেশে গান বানানোর পরিবেশটা ঠিক নেই। ইকোসিস্টেম যাকে বলে আরকি। এ কারণে শুধু মিউজিক করে, অন্তত রক মিউজিক করে আসলে অন্য দেশের শিল্পীদের মতো এদেশের শিল্পীরা বেঁচে থাকতে পারবে না। সম্ভব না। 

তবে আমরা তো গান গেয়েই যাচ্ছি। আমাদের সিনিয়র জুনিয়ররাও গাচ্ছে। একটা চেষ্টা তো আমরা এখনো করে যাচ্ছি। আশা করি, সামনে এই অবস্থা পাল্টাবে। হয়ত একটু সময় লাগবে। 

রাহিন: কিন্তু, এই অবস্থা কেন? বাংলাদেশে ব্যান্ড মিউজিক চলছে প্রায় ৩০ বছর ধরে। 

জিহান: আরো বেশি হবে….

রাহিন: হ্যাঁ, আরো বেশি হবে। এই ৩০ বছরে দুর্দান্ত আইকনিক সব শিল্পী, রকস্টার আমরা পেয়েছি। দুর্দান্ত সব গান রিলিজ পেয়েছে। এরপরেও কোনো অবকাঠামো নাই কেন?

রিয়াসাত: এই প্রশ্নের উত্তর আসলে হাইপোথেটিকাল হয়ে যাবে, কারণ আমি আসলে জানি না এটা কেন হয় নি, বা এর পিছনের কারণগুলো কী কী। ছোটবেলায় আমরা বাচ্চু স্যারের গান শুনে বড় হয়েছি। তাঁদের কথা মানুষ মনে রাখছে কীভাবে? তাঁরা কালজয়ী কিছু গান বানিয়েছেন যেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছেছে, অনেক মানুষ শুনেছে।

ঐসময়ের মিউজিকের কথা চিন্তা করলে দেখা যায় মিউজিক কিন্তু দুই রকমের। একটা মূলধারার, যেটা সবসময় মোটামুটি একই ধারা বজায় রাখে। আরেকটা হচ্ছে অল্টারনেটিভস্, অফ স্ট্রিম। আইয়ুব বাচ্চু স্যার, জেমস্ স্যাররা যখন শুরু করেছিলেন তখন দেখা গেছে মানুষ কিছু নতুন জিনিস শুনতে পাচ্ছে। মানুষ এমন নতুন কিছু শুনতে পেলে বাজিয়ে দেখতে চায়, দেখি তো এটা কী? এই ধরনের। 

আর সেই সময়ের ওই গানগুলো আলাদা বলেই মানুষ আকর্ষিত হয়েছে। একই জিনিস ব্ল্যাক একসময়ে করেছে, আর্টসেল করেছে। They became huge, right?

কিন্তু কোনো কিছুর ভালো অবস্থা তো আর সবসময় থাকে না। গান করলে ছেলেপেলে আগে নিজেদেরকে কুল ভাবত। এখন তো গান ব্যাপারটা আর কুল নাই। আরো হাজারটা জিনিস আছে পাশাপাশি। 

তাই মানুষের কাছ থেকে এখন গান ব্যাপারটা আস্তে আস্তে সরে আসছে। আমরা তাদের কাছে গান নিয়ে পৌঁছাতে পারছি না। আবার ইন্ডাস্ট্রি না থাকার কারণে গান নিয়ে মানুষের কাছে পৌছানোর জন্য যা যা করা দরকার, সবকিছু আমাদেরকেই করতে হয়। প্রমোশন, লজিস্টিক্সের কাজ, সব তো আমাদের উপরেই।

আমরা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ব্যান্ড। এটা আমাদের একটা সুবিধা। অনেক ব্যান্ডই একসাথে থাকতে পারে না কেন? কারণ একটা সময়ের পর তারা টিকে থাকতে পারে না। এখন মানুষের কাছে হাজারটা জিনিস আছে, ভাবার মতো, করার মতো। Tiktok is the new cool, right? কেন নিউ কুল? কারণ টিকটক করে মানুষ পপুলার হচ্ছে।

এরকম অনেক ছোটখাটো ব্যাপার আছে। ইন্ডাস্ট্রি তাই তৈরি হচ্ছে না। হয়তো একসময় সুযোগ এসেছিল। সে সময় কেন হয় নি, সেটা আমি জানি না। আমরাই তো এখনো ছোট মানুষ, তাই বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কম। 

 

অনিন্দ্য:পুরোনো যেসব ব্যান্ড আছে বা এই সিনিয়র শিল্পীদের যেসব ব্যান্ড কমিউনিটি আছে  বাম্বার মতো যারা শিল্পীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে, তাঁরা নতুন শিল্পী বা ব্যান্ডগুলোর প্রতি কতটা আন্তরিক?  

রিয়াসাত: আমাদের একেবারে সিনিয়র যেই ভাইয়েরা বড় বড় ব্যান্ডে আছেন, তারা নানাভাবে পরামর্শ দেন, ঠিক পথে গাইড করেন। আমাদের মিউজিক কেমন হওয়া উচিত — এসব পরামর্শ দিয়ে অনেক সাহায্য করেন। সবাইকেই সাহায্য করেন। বাম্বা নতুন নতুন ব্যান্ডগুলোকে একটা বড় ছাতার মধ্যে আনছে, একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। এটা অনেক বড় একটা ব্যাপার। 

কিন্তু শুধু ব্যান্ডগুলো একসাথে মিলে কিছু করা যাবে না। একটা ইন্ডাস্ট্রিতে কিন্তু অনেক ধরনের, অনেক পর্যায়ে মানুষ থাকে। কারো কারো কাজই হচ্ছে কেবল গান প্রমোট করা, গানের পিআর যাকে বলা যায়।

গান প্রমোট করেই বাইরের দেশে বহু মানুষ ভালো পরিমাণে টাকা কামায়। আমাদের দেশে তো সেই জিনিসটাই নেই। বাম্বা গাইড করতে পারবে, কিন্তু গান তো আর মানুষের কাছে দিয়ে আসতে পারবে না। 

সেটার জন্য আলাদা সেক্টর লাগবে। শিল্পীদের পিছনে ইনভেস্ট করা লাগবে। প্রথমে হয়ত কিছু লস হবে, কারণ সেটা একবারেই নতুন জিনিস। কিন্তু আস্তে ধীরে একটা অবকাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে হয়তো সবকিছু ঠিক হওয়া শুরু করবে। 

 

অনিন্দ্য: আগে যেমন টেলিকম কোম্পানিগুলো ব্যান্ডদের স্পন্সর করত, শো স্পন্সর করত, এখন তো সেভাবে আর স্পন্সর করে না… 

রিয়াসাত: এটা আসলে খুবই ভালো পয়েন্ট। ডিরক্সটারস (Derockstars) আগে একটা বিশাল বড় টেলিকম কোম্পানি স্পনসর করত। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি ব্যান্ডগুলোকে বিভিন্ন কোম্পানি স্পন্সর করছে। এখন সেটা আর দেখা যায় না। একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অন্য অনেক কিছু ব্যান্ড মিউজিকের এই জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে। 

 

রাহিন: একটু আগে যখন বললেন আপনাদের কাছের সিনিয়র মিউজিশিয়ানরা বেশ সাহায্য করেন, একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। রাফা ভাই (এভয়েড রাফা) বেশ কিছুদিন আগে একটা পডকাস্টে তাঁর শিল্পী হিসেবে গড়ে ওঠা নিয়ে কথা বলছিলেন। এক পর্যায়ে শোনালেন কীভাবে তাঁদের জেনারেশনের ব্যান্ডগুলো কীভাবে বেসবাবা সুমনের স্টুডিওতে কাজ করতে করতে, আড্ডা মারতে মারতে বড় হয়েছেন। ব্যাপারটা নাকি এমন, যে বেসবাবা শুধু বিরিয়ানী খাওয়াতে খাওয়াতেই দেশের ৪০টা ব্যান্ড গড়ে তুলেছেন। 

রিয়াসাত: হ্যাঁ, হ্যাঁ, এটা নিয়ে একদিন কথা হচ্ছিল রাফা ভাইয়ের সাথে (হাসি)…

রাহিন: হ্যাঁ। রাফা ভাইয়ের কথাতে বোঝা যায় যে তাদের প্রজন্মের ব্যান্ডগুলো গড়ে উঠার পিছে বেসবাবার মতো শিল্পীদের একটা ডিরেক্ট অবদান ছিল। তাঁরা ছোটদের জায়গা দিয়েছেন, আড্ডা মেরেছেন, নানাভাবে সাহায্য করেছেন। ব্যান্ড কমিউনিটিতে কি এই ব্যাপারটা এখনো আছে? মানে আপনাদের বড় হওয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের থেকে সিনিয়র শিল্পীদের অবদানটা কি এখনো আগের মতোই বিশাল? 

রিয়াসাত: এটা আসলে অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে কার সাথে কার কেমন সম্পর্ক, সেটার উপর। গান করতে করতে অনেকের সাথে ভালো সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের কথাই ধরি। রাফা ভাই হচ্ছেন এমন একজন মানুষ যার বাসায় ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা মারা যায়। দেখা যায়, রাফা ভাই কোনো গান শুনাচ্ছেন। আমরা জানতে চাচ্ছি — ভাইয়া, এটা কীভাবে করব, ওটা কীভাবে করব। উনি বলেন। আমরা তো তাদের দেখেই গান নিয়ে কাজ করা শুরু করেছি। 

আর সুমন ভাই তো সুমন ভাই। তিনি যেভাবে মানুষের জন্য করেছেন, অন্যদের তো আসলে এই দায়িত্ব নেয়ার কোনো কারণ নাই। এটা কোনো বাধ্যতামূলক দায়িত্ব না যে করতেই হবে। কারও যদি নিজে থেকে করার ইচ্ছা করে, সেটা খুবই ভালো। আর কেউ যদি না করতে চায়, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। 

 

অনিন্দ্য: বাংলাদেশী ব্যান্ডগুলোর মধ্যে কারা আরেকটা রক ব্যান্ড-কে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে? 

রিয়াসাত: আমি তো পার্সোনালি জন ভাইয়ের অনেক বড় ফ্যান, বাংলা রক মিউজিকের মধ্যে ব্ল্যাক-এর ফ্যান। এরপর নেমেসিস, নেমেসিসের কাজ আমাদের অসম্ভব ভালো লাগে। (হাসি) জিহান পাশ থেকে “নেমেসিস, নেমেসিস” বলে চিল্লাচ্ছে। এরপর ইন্দালো তো আছেই, আর্টসেল আছে৷ বাংলাদেশের যারাই গানবাজনা করেছে, তাদের একটা আর্টসেল ভক্তির সময় গেছে। 

(জিহানের দিকে তাকিয়ে) জিহান বাদে। অদ্ভুতভাবে, জিহানের কোনো আর্টসেল ফেইজ যায় নাই। তবে আমাদের বাকিদের ক্ষেত্রে আর্টসেল একটা বিরাট প্রভাব ছিল। আমাদের সবার ক্রিপ্টিক ফেইট প্রচণ্ড ভালো লাগে। ক্রিপ্টিক ফেইটের গান এখনো আমরা সবাই একসাথে বসে শুনি আর ভাইব করি। তারা এত জোস, বাংলাদেশের সবচেয়ে কুল ব্যান্ড বলে মনে হয় আমার।  

 

রাহিন: আপনাদের প্রজন্মের অনান্য ব্যান্ডগুলোর সাথে আপনাদের তো বেশ ভালো সম্পর্ক। আপনারা একসাথে আড্ডা মারেন, একসাথে কাজ করেন। এইডা, ড্যাডস্ ইন দ্য পার্ক, কনক্লুশান, আরো যেই ব্যান্ডগুলো আছে — এই কনটেম্পোরারি ব্যান্ডগুলোর মধ্যে কাদের গান আপনাদের সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, প্রভাবিত করে? আরেকটা রক ব্যান্ড-এর সবচেয়ে বড় কম্পিটিশন কারা?  

রিয়াসাত: (প্রশ্নটা শুনেই ক্যামেরার সামনে থেকে মাথা উঁচু করে হেসে দিলেন)

অবস্থাটা বলি। আমাদের সামনে এখন কনক্লুশনের একজন মেম্বার বসে আছে – যাকির। এখন কনক্লুশান বাদে অন্য কোনো ব্যান্ডের নাম নিলে ঝামেলা আছে, ও কিন্তু মাইন্ড করবে। 

তামাশা বাদ দিলেও, কনক্লুশান। এমনকি গত রাতেও আমরা কনক্লুশানের গান শুনছিলাম আর একসাথে গাচ্ছিলাম। তারপর ড্যাডস্ ইন দ্য পার্ক। খুবই ভালো লাগে। কনক্লুশানের গান হয়ত একটা নির্দিষ্ট ধরনের মুডে ভালো লাগে৷ 

ড্যাডস্ হয়ত আরেকটা মুডে শুনি, তখন ড্যাডস্ ভালো লাগতেছে। এই দুটি ব্যান্ড-ই প্রচণ্ড ভালো। এখন যত কন্টেমপোরারি ব্যান্ড আছে, যেমন লেভেল ফাইভ; তারপর স্মুচেস — ওরা কালকে একটা গান রিলিজ করেছে। খুবই ভালো গান। আমি মনে করি এটা বেশ ভালো, কারণ আমরা সবাই মিলে মিউজিক করছি এবং ভালো গান বানাচ্ছি। 

 

রাহিন: রিয়াসাত ভাই কয়েকদিন আগে একটা পোস্ট শেয়ার করেছিলেন, পোস্টটা এমন ছিল যে বইমেলায় নতুন বই প্রমোট করার কোনো সংস্কৃতি এই দেশে নাই। লেখক আছে, কিন্তু প্রমোশন নাই। অনেক লেখক আছে, কিন্তু আমরা তাদের বই পড়ছি না। ঐ পোস্টের থিমটাকে বিবেচনা করে যদি প্রশ্ন করি, আমাদের সার্বিক শিল্প – সেটা সাহিত্য হোক, গান হোক, আমরা কি একটা সৃজনশীল একটা খড়ায় ভুগছি? ক্রিয়েটিভ ব্যাংকরাপ্টসি যাকে বলে আর কি।  

আমাদের বইমেলায় এখন ইংরেজি শেখার বই বেস্টসেলার হচ্ছে, “বাবু খাইছো” গানে মিলিয়ন ভিউ থাকছে। একটা নতুন অ্যাকাউন্ট থেকে ইউটিউবে ঢুকলে ওয়াজের ভিডিও সামনে আসছে, বাংলাদেশী একাউন্ট বলে ইউটিউব অ্যালগরিদম ওয়াজের ভিডিও দেখাচ্ছে। কিন্তু এটা কেন হচ্ছে?

দশ বছর পেছনে যদি আমরা তাকাই, তাহলে দেখব আইকনিক মিউজিসিয়ান ও লেখকদের একেকটা কাজ, একেকটা কথা মানুষকে অভিভূত করত। এখন কেন হচ্ছে না? এর কারণ কি মানুষকে প্রভাবিত করার মতো শিল্পী কমে যাচ্ছে, নাকি ভালো জিনিস নেয়ার মতো মানুষের গড় ইন্টিলিজেন্স কমে যাচ্ছে? কী হচ্ছে আসলে? 

রিয়াসাত: মানুষের গড় ইন্টেলিজেন্স কমেছে কি না সেটা তো আমরা মাপতে পারি না। আমার কাছে যেটা ইন্টেলিজেন্ট কন্টেন্ট মনে হচ্ছে, সেটা আমার পাশে যে বসে আছে তার কাছে তেমন নাও লাগতে পারে। ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপারটা অব্জেকটিভলি ব্যবহার করা গেলেও এর ভেতরে অনেক সুক্ষ্ম ব্যাপার আছে। 

কেউ ইন্টেলিজেন্ট কি না তা কীভাবে বুঝবা? ধরো আমি চুল-দাড়ি বড় রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছি, তাহলে মানুষজন তো আমাকে দেখে বলবে আমি পাগল, নয়তো বোকা, চুল কেন বড় রেখেছি। অথচ আমি তো ইন্টেলিজেন্ট একজন মানুষ-ই। 

এখন যেই ধরনের গান বা কন্টেন্ট তৈরি হচ্ছে, যেগুলো অনেক হিট খাচ্ছে, সেগুলো শ্রোতার সাথে কোনোভাবে কানেক্ট করতে পারছে। ধরো, “বাবু খাইছো” গানটায় মানুষ বাবু খাইছো  কথাটার সাথে মানুষ কোনোভাবে রিলেট করতে পেরেছে বা মজা পেয়েছে। কোনোভাবে এটা একটা ভূমিকা রেখেছে। এই কারণে গানটা হিট খাচ্ছে আর এত মানুষ শুনেছে। 

আবার, ইংরেজি শেখার বই মানুষ কিনছে কারণ তারা মনে করছে উপন্যাস পড়ার থেকে এখন ইংরেজি শেখাটা জরুরি। এর কারণ কী তা বোঝার জন্য আমাদের আরও গভীরে গিয়ে আর্থ-সামাজিক গবেষণা করতে হবে। এটা এত সহজে বলা সম্ভব না। 

কিন্তু এখন মেইনস্ট্রিমের বাইরের যে ক্রিয়েটিভ মানুষগুলো আছে তারা এখন আর আগের মতো সেই জোরটা পায় না মানুষের কাছে পৌঁছানোর। আগে সবকিছুর পরিধি খুব ছোট ছিল, এখন অনেক বড়।

এখন অন্যান্য সেক্টর অনেক ডেভেলপ করছে। ক্রিয়েটিভ দিকে যারা আছি, আমরা ছিটকে পড়ে যাচ্ছি। এখন কন্টেন্ট ইন্টেলিজেন্ট কি না সেটা আসলে আমি জানি না। 

 

অনিন্দ্য: আপনাদের প্রজন্মের সবাই তো গানবাজনা শুরুই করেছেন সোশাল মিডিয়ার যুগে। কিন্তু এই যে অ্যানালিটিকসের উপর গানের নির্ভরশীলতা, অ্যালগরিদমের উপর এত কিছু, এটাকে কীভাবে দেখেন? জন ভাই-ও একবার তার পডকাস্টে বলেছিলেন যে এখন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সাথে গায়কদের প্রতিযোগিতা চলে। এই বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখেন?

রিয়াসাত: এটা বুঝা যাচ্ছে যে এখন আর মিউজিকের ক্ষেত্রে আগের পি.আর. স্ট্র‍্যাটেজি কাজ করবে না। এ ব্যাপারে জিহান বলুক, এটা জিহানের স্পেশালিটি। 

জিহান: এখন সবাই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হতে চায়। শুধু মিউজিসিয়ান হয়ে থাকাটা আর কাজ করছে না। শুধু গায়ক হিসেবে তুমি আগের মতো আর জনপ্রিয় হবা না। মানুষ যেহেতু এত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে, আমাদেরকেও ব্যবহার করা লাগবে। শুধু ফেসবুক বা ইউটিউবে থাকলেও হবে না। সব জায়গায় থাকার জন্য আমাদের ডিফারেন্ট কাইন্ড অফ কন্টেন্ট বানাতে হবে। 

আরেকটা রক ব্যান্ড হিসেবে আমরা এগুলো করতে চাই। অনেক ধরনের বাধার কারণে এখনো পারি নাই। কিন্তু করব, তাই না, আযমী? 

রিয়াসাত: হ্যাঁ, আমরা যদি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে না চলতে পারি, তাহলে তো যেখানে আছি সেখানেই পড়ে থাকব। আমি মনে করি, আমাদের এর সাথে মানিয়ে নিতে হবে। যুগে যুগে মানুষের চাহিদা পাল্টাবে, তার সাথে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া উপায় নাই। 

 

রাহিন: এই সূত্রে একটা প্রশ্ন করি, মিউজিক সার্ভাইভ করার জন্য মিউজিকের মার্কেটিং কি এক পর্যায়ে মিউজিক থেকে আমাদের ফোকাস সরিয়ে নেয়? সেটা মিউজিক ভিডিওর মাঝে ইনোভেটিভ কিছু হতে পারে ; মিউজিকের উপর বিভিন্ন কন্টেন্ট হতে পারে, লাইভ বা পডকাস্ট হতে পারে।

রিয়াসাত: হ্যাঁ, অবশ্যই। সেটা অলরেডি হয়ে গেছে।

রাহিন: শূণ্য  “বেহুলা” গানটা বের করার পর গানটা নিয়ে যতটা না আলোচনা হয়েছে, প্রায় একই পর্যায়ের আলোচনা হয়েছে মিউজিক ভিডিওটা নিয়ে, গানের থিম বা স্টোরিটা নিয়ে। এভাবে মিউজিকের উপর থেকে আমাদের নজর সরে আসা সার্বিকভাবে গানের জন্য কি খারাপ?  

জিহান: এতে তো ক্ষতি নাই। মিউজিক, গান, বদলাবেই। আমরা আগে যেভাবে গান শুনতাম, এখন তো সেভাবে শুনি না, দেখি না। আগে লাইভ পার্ফরমেন্স এক টাইপের হতো। টেপ রেকর্ডিং খুব একটা ভালো ছিল না। হয়তো বছরে একটা শো দেখা যেত। এখন আমরা মোবাইলের একটা অ্যাপে টানা গান শুনি। আমাদের কনসাম্পশন মেথড পাল্টে গেছে।

আমরা এখন অনেকগুলো আর্টের ফর্মকে একসাথে মিলিয়ে কাজ করছি। করা লাগবে। ভিজ্যুয়াল এবং মিউজিক, পাশাপাশি। একটা গল্প বলার মতো। আমি এতে কোনো সমস্যা দেখি না। দুটোই শিল্প। 

রিয়াসাত: কিন্তু সবকিছু নিজেদেরই করতে হলে, সেটা সমস্যা। আমি মিউজিক ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ভাবতে চাই না। কিন্তু আমাকে প্রমোশন নিয়ে ভাবতে হয়। এটা তো আমাদের করা উচিত না। এটাই খারাপ লাগে। আমাদের গান ছাড়ার স্ট্র্যাটেজি কী হবে, এটাও আমাদেরই ভাবা লাগে। সব নিজেদেরই করা লাগবে। কারণ কিছু তো করার নাই, সাপোর্ট নাই কোনো। যদিও একই চিন্তাভাবনার মানুষেরা আমাদেরকে অনেক সাপোর্ট দেয়। এরপরেও। 

 

অনিন্দ্য: এত এত পপুলার লেবেল যেমন: জি-সিরিজ, কিংবা অন্যান্য অনেকেই, এরা থাকা সত্ত্বেও তারা কেন কোনো নতুন ব্যান্ডকে মিডিয়ায় বা ইউটিউব অ্যালগরিদমে প্রমোট করার জন্য পদক্ষেপ নিচ্ছে না, বা এমন স্ট্র‍্যাটেজি বের করছে না যাতে নতুন ব্যান্ডগুলোকে সাহায্য করা যায়?

রিয়াসাত: আমার মনে হয়, ওরা তো নিজেদের মতো করে ঠিকই আছে। যেভাবে তারা কাজ করছে, সেটা হয়তো তাদের কাজে লাগছে। এটা আসলে আমাদের জায়গা থেকে বলা কঠিন যে কেন তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। 

আরেকটা রক ব্যান্ড
আরেকটা রক ব্যান্ড

অনিন্দ্য: অনেক বেশি মানুষ কন্টেন্ট নিয়ে কাজ করছে এখন। আপনারা আলাদা হতে চাচ্ছেন কীভাবে? এখন যা করছেন, সেটা কি যথেষ্ট? 

রাহিন: ধরেন এই যে আপনাদের সামনে কনক্লুশনের জাকির ভাই আছে, কনক্লুশনের থেকে আরেকটা রক ব্যান্ড আলাদা কীভাবে? কীভাবে আলাদা হতে চান?

রিয়াসাত: এবার তো চিপায় ফেলে দিচ্ছো (হাসি)। আমরা আরেকটা রক ব্যান্ডের সবাই হলফ করে বলি যে কনক্লুশান আমাদের থেকে ভালো গান বানায়। তাদের কোয়ালিটি, গানের কন্টেন্ট আমাদের থেকে অনেক অনেক ভালো। 

জিহান: আমরা কনক্লুশনের একটা সিম্পল ভার্সন আর কি।  

রিয়াসাত: আমরা অনেক সহজ মিউজিক বানাতে চাই। আমরা যখন ব্যান্ডটা বানাই, তখন আমাদের চিন্তা ছিল আমরা মানুষের জন্য রেডিও ফ্রেন্ডলি গান বানাব। কোনো অস্পষ্ট কাজ আমরা করতে চাই নি। এখনও সেই চিন্তাটা থেকে সরে আসি নাই, যদি সামনে ইচ্ছা করে তাহলে হয়ত সরতেও পারি। 

এখন আলাদা করে কিছু বলতে পারব না। কনক্লুশানের কিছু ভালো দিক আছে। আরেকটা রক ব্যান্ডের কিছু ভালো দিক আছে। সবাই যার যার মতো করে আলাদা। যার যখন যেটা শুনতে ভালো লাগে আর কি। যেমন ধরো আমার মেটালিকা শুনতে ভালো লাগে, আবার হঠাৎ মেগাডেথ শুনতেও ভালো লাগে। কিছুক্ষণ মেটালিকা শুনলাম, এরপর মেগাডেথ। জিনিসটা এরকম। যখন যেটা ভালো লাগে। 

 

অনিন্দ্য: আপনাদের কন্টেম্পোরারি ব্যান্ড বা আপনাদের আগের ব্যান্ডগুলোর রক বেসড্ স্টাইলটা কি অনেক বেশি পশ্চিমা প্রভাবিত? সাধারণ মানুষের পছন্দের সাথে কি এটা যাচ্ছে না? কারণ একটা নির্দিষ্ট গ্রুপের বাইরে তো এই স্টাইলের গান খুব একটা চলছে না, তারা হয়তো কানেক্ট করতে পারছে না।

রিয়াসাত: এটা সত্যি। আমাদের গান অল্প কিছু মানুষই শুনে। সবাই শুনে না, আর সবাই শুনলে তাদের ভালো লাগবেও না। আমরা আসলে কে শুনবে কে শুনবে না তা চিন্তা করে গান বানাই না, আমরা যা করছি ভেতর থেকে করছি। হয়তো একটা সময় এর থেকে বেশি মানুষ আমাদের গান শুনতেও পারে, না-ও শুনতে পারে। আমরা আমাদের মতো করে যাব

 

রাহিন: এখন আরেকটা রক ব্যান্ড-এর গানের স্টাইল নিয়ে একটা প্রশ্ন আছে। আপনাদের গানে অনেক অ্যালেগোরিকাল লিরিক্স থাকে। এই যে রূপকধর্মী লিরিক্স থাকার একটা প্যাটার্ন আপনাদের গানে প্রায়ই দেখা যায়, এর পেছনে কি কোনো কারণ আছে? 

রিয়াসাত: এর কারণ হচ্ছে আরেকটা রক ব্যান্ড এর সব লিরিক্স আমি লিখি। আমি এটা ছাড়া আর কিছু পারি না আসলে। এখন পর্যন্ত আমার মনমতো মানুষের জন্য জীবনমুখী গান আমি লিখতে পারি নাই। যদি কোনোদিন হয়, তাহলে করব। 

 

রাহিন: এবারের প্রশ্নটা একটু হাইপোথেটিকাল। শিল্পের অরাজনৈতিকতা নিয়ে। আর্টের সাথে তো রাজনীতির একটা সম্পর্ক আছে। সবকিছুর সাথেই আছে। থিওরেটিকাল অনেক জার্গনে যাওয়া যায়। অত কথা বলব না। কাছের একটা উদাহরণ দেই। এইতো সেদিনই কলকাতার কিছু শিল্পী একত্র হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেন, একটা গানের মাধ্যমেই। তাদের শিল্প দিয়েই তারা পলিটিকসে অংশগ্রহণ করেছেন। 

বাংলাদেশে তো এই ধরনের কোনো উদাহরণ দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায় না। নেমেসিসের কিছু পলিটিকাল গান আছে, এটা পলিটিকাল অ্যালবাম আছে। এটাই প্রশ্ন যে, আমাদের আর্ট কি প্রচণ্ড অরাজনৈতিক? এই অরাজনৈতিকতার কারণ কী? অবদান কি পলিটিকাল ক্লাইমেটের, নাকি শিল্পীদের? 

রিয়াসাত: আমাদের দেশের সাধারণ শ্রোতারা অনান্য দেশের শ্রোতাদের থেকে অনেক আলাদা। আমরা জাতীয়বাদী সেন্টিমেন্ট থেকে রক অ্যান্ড রোল মিউজিক করি। ষাটের দশকে আমাদের যেই রক গান তৈরি হয়েছে, সেটা কিন্তু অনেক অ্যান্টি এস্ট্যাবিশমেন্ট ছিল। 

কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে অনেক দেশপ্রেমিক — কালচারালি, ঐতিহাসিকভাবেই। সেই সেন্টিমেন্টের কারণে আমাদের দেশে রক মিউজিকের পলিটিকাল দিকটা অনেক জাতীয়তাবাদী। খুব কম মানুষ এর বাইরে গিয়ে কাজ করে; আমি কিছু ব্যান্ড চিনি এমন, কিন্তু ওদের গান সেভাবে মানুষ শুনে না। তবে তোমরা লীলা-র গান শুনে দেখতে পারো।

 আমরা আবার জাতি হিসেবে অনেক আবেগপ্রবণ, তাই আমাদের ভালোবাসা নিয়ে গান অনেক বেশি। এটা সব জায়গায়ই আছে। ভালোবাসার গান সবজায়গায় বেশি। এটা অস্বাভাবিক না। 

রাহিন: ভালো-খারাপের বিচারে যাব না। তবে এর তো একটা প্রভাব আছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে পলিটিকাল ক্লাইমেটের অস্তিত্ব, তার কারণে সংখ্যালঘুরা অহরহ নানান কারণে ভুগছে, নানান জায়গায় মানুষ সমস্যায় ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে শিল্পের নানান ফর্ম যদি এই মানুষগুলোকে নিজেদের শিল্পে জায়গা দিত, তাদের জন্য কথা বলত, তাহলে হয়তো আমরা একটা সংস্কৃতি পেতাম যার মাধ্যমে এ বিষয়গুলো উঠে আসে। 

রিয়াসাত: আমাদের সিস্টেম আসলে আর্টিস্ট ফ্রেন্ডলি না। শিল্পীদের সৃজনশীল পৃথিবী যতটা বড় হওয়া উচিত, সেটা আমাদের নেই। আমরা একজায়গায় আটকে থাকতে চাই। আমাদের মধ্যে সহনশীলতা কম ভিন্নমতের প্রতি। একজন মানুষ যে ভিন্নমতাবলম্বী হতে পারে, সেটা গ্রহণ করার মানসিকতা আমাদের মধ্যে একটু কম। একই মতের মানুষকেই আমরা বেশি প্রাধান্য দেই। এই কারণে আমি মনে করি আমাদের মিউজিক আগামী ২০-৩০ বছরেও রেইজ এগেইন্সট দ্য মেশিন-এর মতো অত পলিটিক্যাল হবে না। তুমি যেটা বললা আর কি, কারণ আমাদের ক্লাইমেটটাই সেরকম না। 

তবে আসা উচিত। আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড মেটালের গানের কথা যদি খেয়াল করো, ওদের মধ্যে অনেক পলিটিকাল গান আছে, আবার অনেক অন্যরকম থিম-ও আছে যেগুলো মেইনস্ট্রিম না। থ্র‍্যাশের একটা গান আছে – ইন্ডিয়ানাইজেশন। গানের নাম-ই ইন্ডিয়ানাইজেশন, চিন্তা করো কি সাহসী! তবে এ ধরনের গান মানুষ অত শুনে না।  

 

অনিন্দ্য: আমরা ইন্টারভিউয়ের শেষ পর্যায়ে প্রায়। আপনাদের একটা প্ল্যান ছিল যে দুই বছরের মধ্যে পাঁচটা সিঙ্গেল গান রিলিজ করবেন। এখন যেহেতু করে ফেলেছেন সেটা, সামনে আপনারা কী করবেন?  

রিয়াসাত: আমাদের আসলে প্ল্যান ছিল দুই মাসে একটা করে গান ছাড়া। এখন আমরা বুঝছি যে নানান কারণে এই কাজটা সম্ভব-ই না করা। দুনিয়ায় আসলে এরকম অবস্থা হবে তা তো আমরা ভাবি নাই। হ্যাঁ, পাঁচটা গান বের হয়েছে। আমরা খুশি। সামনে আরও কয়েকটা গান বের হবে।  

রাহিন: “শিকারি আজ শিকার” গানটা যখন রিলিজ পেয়েছে, ততদিনে আপনারা জানেন পরের চারটা গানের নাম কী হবে। আপনারা ইন্টারভিউতেও নামগুলো বলে ফেলেছিলেন। এই ধরনের কি প্ল্যান চলছে এখন আপনাদের মাথায়?

রিয়াসাত: কিছু বদল আসবে। লকডাউনের মধ্যে আসলে মন-মেজাজ ঠিক নাই, কী করি বলো? 

অনিন্দ্য: কোনো অ্যালবাম? 

রিয়াসাত: কম্পাইলেশন অ্যালবাম করার একটা চিন্তা আমাদের আছে, সবগুলো গান একত্র করে।  আলাদা করে অ্যালবাম বের করছি না। 

রাহিন: আড্ডা দিয়ে অনেক ভালো লাগল রিয়াসাত ভাই। ধন্যবাদ আপনাদেরকে। 

রিয়াসাত: আমরাও খুবই এনজয় করেছি। এতটা খুঁটিনাটি নিয়ে কথা হবে এটা আমরা ভাবি নাই। থ্যাংক ইউ। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top