‘গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে’: ডিস্টোপিয়ার মোড়কে বর্তমান


ব ই  প র্যা লো চ না


তানজিনা তাবাস্​সুম নোভা


ডিস্টোপিয়া এমন এক ভবিষ্যতের গল্প বলে, যেখানে পৃথিবী ঢেকে আছে অপশাসনের অন্ধকারে অথবা কোনো বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছে পৃথিবীতে। যেখানে মানুষের অস্তিত্বই সংকটাপন্ন। এমন এক ভবিষ্যতের গল্প আমরা দেখতে পাই সুহান রিজওয়ানের লেখা গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে উপন্যাসে।

সিনেমা বানানোর স্বপ্নে ইস্তফা দিয়ে, উপন্যাস লিখবে বলে, ২০৬৮ সালের ডিসেম্বরে সুহান রিয়াসাত যখন ঢাকায় ফিরে আসে, তখন বাংলাদশের শাসনভার ইকবাল খান ও তার নেতৃত্বাধীন ইনসাফ পার্টির হাতে। দুই দশক আগের মহাবিস্ফোরণের ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টারত দেশের মানুষ নানারকম বিধি-নিষেধের ভারে জর্জরিত। এখানে নেই শিল্প-সাহিত্য চর্চার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এরকম পরিস্থিতিতেও ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি এঁকে চলেছে ঋজুশির নামের কেউ।

তবে প্রচলিত ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসের তুলনায় এই উপন্যাস কিছু ক্ষেত্রে বেশ আলাদা। ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসে বর্ণিত পৃথিবী সাধারণত ঐ উপন্যাস লেখার সময় বাস্তব থাকে না। কিন্তু সুহান রিজওয়ান এখানে এমন এক ঢাকা, এমন এক বাংলাদেশের গল্প বলছেন, যে ঢাকা, যে বাংলাদেশ আমাদের কাছে মোটেও অপরিচিত নয়। কালা কানুন, দমনমূলক আইন, শান্তিপ্লাটুন, অপদেবতার মাধ্যমে আড়ি পাতা, সাতকুড়িয়া, জনতার মঞ্চ — এর প্রত্যেকটিই পাঠককে মনে করিয়ে দেবে ১৯৭০ এর দশক থেকে বর্তমান পর্যন্ত ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা।

আঙ্গিকের দিক দিয়েও গ্রাফিতিও প্রশ্ন করে বেশ স্বতন্ত্র। একটি অধ্যায় উপন্যাসের সময়কালের গল্প বলছে, আবার পরের অধ্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে প্রবন্ধ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, চিঠি, ব্যক্তিগত ডায়েরির অংশবিশেষ, বেতাল পঞ্চবিংশতির আধুনিক সংস্করণ, এমনকি বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইত্যাদি নানা কিছুর মধ্য দিয়ে সেসব ঘটনা বা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ উঠে আসছে। আমাদের যাপিত জীবনের আশা, হতাশা, অসহায়তা, আক্ষেপ, “দেশ গোল্লায় যাক” বলে হাল ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা এসব কিছু মিলিয়ে উপন্যাসটি আসলে আমাদের সময়কেই ধারণ করছে।

লেখক যে নিজের নামকে সামান্য পাল্টে দিয়ে মূল চরিত্রের নাম রেখেছেন, তার কারণ হয়তো সুহান রিয়াসাত লেখক নিজেই। সুহান রিয়াসাতের মনের প্রশ্নগুলো, দ্বিধাগুলো হয়তো সুহান রিজওয়ানের মনেও খেলা করে। আবার, সুহান রিয়াসাতের মধ্যে পাঠক হয়তো নিজেকে খুঁজে পাবেন।

উপন্যাসজুড়ে করা অসংখ্য প্রশ্নের সাথে একটি প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে, আমরা কেন লিখি, কেন আমাদের লিখতে হবে। আরেকটি কথাও বারবার এসেছে, লেখা আসলে নিজেকে আবিষ্কারের একটি যাত্রা। কিংবা, লেখার কারণ হতে পারে যেমনটা সুহান রিয়াসাত বা রিজওয়ান বলেছেন, “লিখি, কারণ মনে হয়, একদিন আমার লেখাকে কেউ ভালোবাসবে…” 

সুহান রিজওয়ানের প্রথম উপন্যাসটি ছিল ইতিহাসভিত্তিক, দ্বিতীয় উপন্যাসে এসে তিনি বললেন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ঘিরে নানা সমস্যার কথা, আবার তৃতীয় উপন্যাসে তিনি বেছে নিলেন ডিস্টোপিয়া। বিষয়বস্তুর ভিন্নতার সাথে তাঁর ভাষার ব্যবহারে ভিন্নতা আসে, ভিন্নতা দেখা যায় তাঁর গল্প বলার ধরনেও। প্রতিটি উপন্যাসে নিজেকে ভেঙ্গেচুরে ফেলার লেখকের এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক, সেই আশাবাদ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top