Close

আকাশ, উল্কা ও তারার গল্প


ফাতিন হামামা


“শওকত সাহেব লেখা থামিয়ে ছাতিম গাছটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ তার মনে হল, বৃক্ষরাজি সবসময় আকাশ স্পর্শ করতে চায়। সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। আর মানুষ চায় মাটি ও জলের কাছাকাছি থাকতে। তিনি খুব কম মানুষকেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছেন।”

[নীল অপরাজিতা, হুমায়ূন আহমেদ]

 

কথা সত্যি। আমরা বাস্তবতার বৃহত্তর মুখচ্ছবিকে পুরোপুরি ভুলে অতি তুচ্ছ বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে বেশি মনোযোগী।

ধরে নেই আকাশ। বিশালতায় ঢেকে রেখেছে মানুষের শহরতলীর অলিতে গলিতে বন্দি হয়ে থাকা অবিশাল গল্পগুলোকে। নিশ্চুপ হয়ে দেখে যাচ্ছে অনবরত। রাতের একলা পথে কে বিষাদ মেশানো দৃঢ় অভিমানের বোঝা বয়ে হাঁটছে, মফস্বল শহরের জরাজীর্ণ লাল ইটের দোতলা বাড়ির বারান্দায় বসে চার দেয়ালের কারাগারে থেকেও কে মন ভরে স্বপ্ন দেখছে, সবই আকাশ জানে।

দায়বদ্ধতার পেষণে গুঁড়িয়ে যাওয়া হাজারো সাধ, চিরতরে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের স্মৃতিগুলো, শত আশা, শত নিরাশা – সবই পুঁথিবদ্ধ করে রেখেছে এই আকাশ, তার সীমাহীন উদারতায়। অথচ তিমির পথের অভুক্ত কুকুরগুলোর মধ্যরাতের হাহাকার ছাপিয়ে কে বা আকাশকে কল্পনায় আসন পেতে দেয়? দিনের শুরুতে, মধ্য দুপুরে, দিনশেষে হাজারো রঙের পসরা নিয়ে এই ইট পাথরের গোলকধাঁধায় নেমে আসা আকাশকে কে বা নিজের মাঝে ক্ষণিকের জন্য হলেও আপন করে নেয়? কেউ কি আদৌ কখনো দাবি করে যে সূর্যাস্ত তার প্রিয় রঙ?

এত অবহেলায় জর্জরিত আকাশ কিন্তু আমাদের মত পিশাচশ্রেণির মানুষগুলোর প্রতি একটুও অভিমান করে নেই। কী ধৈর্য! দিনের পর দিন সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে বারবার বেঁচে ফিরে আসছে, প্রহরের পর প্রহর অপেক্ষা করছে একটু মমতার জন্য, না পেয়ে দিনশেষে আবার তলিয়ে যাচ্ছে নিকষ কালো আঁধারে। আজ নয়তো কী, কাল আবারো আসব!

এটাই হয়তো ভালবাসা। এত অভিমানের পরেও ভেতরে একটুখানি আশা সবসময়ই জেগে থাকে!

খুব হলো এই বেচারার কথা। এবার আসা যাক মানুষের একান্ত অন্তঃস্থ গগনের কথায়।

মানুষ। ৩ অক্ষরের ছোট্ট শব্দ। অথচ একে নিয়েই  বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যত রহস্যের তোলপাড়! তার সারা জীবনের দুঃখ-হাসি, লজ্জা-আফসোস, আশা-নিরাশা নিয়ে তৈরি সিন্ধুর প্রশস্ততা প্রশান্ত বাবুকেও লজ্জার ফেলে দেবে। এই মানুষের ভেতরের সাগরটাই যদি এতো গভীর হয়, তাহলে কে জানে তার উপরের আকাশটা কতই না বিশাল! সেই আকাশে অগণিত তারা হয়ত নেই, কিন্তু হাতে গোনা যে কয়টি আছে, ওরা থেকে যাবে। লাইট পলিউশন অনেক। তাই এদের মাঝে অনেকেই প্রতিবেশীর মত দ্যুতি ছড়াচ্ছে না, কিন্তু তবুও আলো দিচ্ছে। কিছুটা হলেও দিচ্ছে।

আকাশের মতো তার সন্তানরাও অনেক ধৈর্যশীল। সমুদ্রের ঊর্মিমালায় আটকে থাকা জীবনে জাহাজের নাগাল ছেড়ে তারার পানে মুখ তুলে তাকানোর সময় মানুষের না থাকলেও, তারাগুলো ঠিকই আমাদের দিকে চেয়ে আছে। অভিমান করে কিছুক্ষণ মেঘের আড়ালে চুপটি করে পড়ে থাকলে থাকতেও পারে, তবে একটু পর সেই আগের জায়গাতেই এসে উঁকি দিবে।

তাই বলে যে ক্ষণস্থায়ী উল্কার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তারকারাজির কথা ভুলে যাব, তা কী হয়!  উল্কারা আসবে, দেখা দেবে, আবার হারিয়ে যাবে। কিন্তু তারা? নিজের ইচ্ছায় আছে, থাকুক না! একটু মূল্য দিতে কী যায়! এরা আমাকে ভালোবেসেই যাচ্ছে, উল্কার পিছে ছুটে গেলে আকাশের তারাগুলো আমার পেছনেই ছুটে আসবে। কী দরকার ওদের এই অপমানের?

আমার আকাশটা না হয় তাদের দখলেই থাকুক। পথের শেষে এসে যাতে শূন্য আকাশের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে না হয়।

তারারা ভালো থাকুক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

5 − one =

Leave a comment
scroll to top