Close

অজ্ঞাতবাসের পত্র


ময়েজ উদ্দীন আশরাফী


কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলো বিষাদশূন্য হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষের সঙ্গ থেকে মুক্তি। কিছুদিন ধরে আমি এই স্বর্গতুল্য স্থানে আইসোলেশনে আছি। ঘরের একটা কামরা আমার জন্য বরাদ্দ। বেশ ছিমছামই বলা চলে। বেঁচে থাকতে আমার যা দরকার এখানে সবই আছে।

আমার মতো আরো অনেকেই শুনছি আইসোলেশনে আছে। আমার ঘরে আছে – এমন প্রতিটি জিনিসেরই এখানে স্থান পাওয়ার পেছনে একটা সঙ্গত কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু এই টেলিভিশন সেটটার ক্ষেত্রে তেমন কোনো জোরালো যুক্তি আমি এখনো দাঁড় করাতে পারি নি। তবে পেয়ে যাব।

এখন মানবজগতের অহেতুক কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট ঝামেলা বা বিশৃঙ্খলার যন্ত্রণা নেই। একজন মানুষের সাথে অবশ্য দেখা হয়। কিন্তু সে মানুষটি এখনো অপুরো। বয়স কত হবে? এই ষোলো-সতেরো। তাকে অবশ্য আমি সেভাবে দেখতে পাই নি। আপাদমস্তক সে থাকে হালকা নীল রঙের কাপড়ে ঢাকা। মুখেও মাস্ক। কন্ঠ শুনে কিশোরী বলেই মনে হয়। বয়স আমার চল্লিশের কোঠায়, তবে মাথার চুল দেখলে কেউ যদি আরেকটু বেশি আন্দাজ করে, তবে তার দোষ দেয়া ঠিক হবে না। কিশোরী কণ্ঠ শুনে তাকে অমায়িক বলা আমার মধ্যযুগীয় রোমান্টিসিজমে বিশ্বাসের ইঙ্গিত বললেও ভ্রু কুঁচকানোর লোকের অভাব হবে না।

মানুষের কোলাহলমুক্ত এই শান্তিপূর্ণ জায়গাটি আমার কাছে ওয়াডসওয়ার্থ সাহেবের ডাভ কটেজের থেকে কম মনে হয় না।  মানুষের সঙ্গ আমাকে কখনো আকৃষ্ট করে নি। মানবজাতি খুবই অসহায়ভাবে স্বাধীন। তাদের এই স্বাধীনতাই তাদেরকে নিজ প্রজাতির লোকদের সৃষ্ট জীবনবিধি পালন করতে বাধ্য করে। জীবনের উদ্দেশ্যকে তারা স্বাধীনভাবে নিজস্ব মননের সন্ধান না করে বরং সহজ পথ অবলম্বন করে। প্রাদুর্ভূত উদ্দেশ্যগুলোর পুনরাবৃত্তি আমাদেরকে এই পক্ষে সুদৃঢ় যুক্তি দেয়। আমি যদি ওয়াডসওয়ার্থ হতাম তবে, ওই বর্ম পরিহিতাকে আমার ডরোথি বানাতে আপত্তি ছিল না। সবকিছুই ঠিক ছিল, শুধু একটাই সমস্যা, সে একজন মানুষ। অবশ্য অসঙ্গতি এংবং ত্রুটিতে পরিপূর্ণ এই অরাজক পৃথিবীতে এইটুকু অসঙ্গতি ক্ষমার যোগ্য।

ওইযে বলে না?

“Speak of the devil and he will arrive.”

আমি অবশ্য বলি নি, বলার কাজটা মনের মধ্যেই হয়তো সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ডেভিলের আগমনের বদলে বোধহয় এঞ্জেলের আগমন ঘটল। একই প্রজাতি তো, শুধু আচরণবিধি ও রূপ বিপরীত মেরুর। সেই হালকা নীল কাপড়ের বর্ম পরিহিতার আমার বদ্ধ কামরায় আগমন। জানাল, সে ডিসইনফেক্টেন্ট স্প্রে করতে এসেছে। আমি বিছানায় শুয়ে তার এই কাজ দেখছি। এক পর্যায়ে আমাকে বলল উঠতে হবে। বিছানার চাদর বদলানো হবে।

১৪ দিনের ব্যাপার। তাই এই মহাসমারোহ।

ভাইরাসটা বেশ শৃঙ্খলা এনেছে এই বিশৃঙ্খল মানুষগুলোর জীবনে। তারা জেনে যায়, ১৪ দিনের মাথায় তার দেহত্যাগের ঘোর সম্ভাবনা রয়েছে। তাই মৃত্যুভয় তাদের অনেককে ধর্মভীরু করে, অনেকে আবার হয় হতাশাগ্রস্থ, অনেক প্রাণে আসে শেষটাকে উপভোগের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই ভাইরাসের আবার একটা গুরুতর দোষ রয়েছে, এটা সংক্রামক। তাই অনেকেরই শেষটা উপভোগের বাসনা অপূর্ণ রাখতে হচ্ছে।

এই ভাইরাসের কথা ভাবতে ভাবতেই ভাইরাস হত্যাকাণ্ড শেষ হলো। হালকা নীল কাপড়ের বর্ম পরিহিতার অন্তর্ধান। কিছুক্ষণ পরে আবার আসলো। এবার আমার সকালের নাস্তা নিয়ে। ডিম, কলা, পাউরুটি, জুস, সাথে কিছু বড়ি।

“ঠিক মতো খেয়ে নেবেন,” বলে আবার চলে গেল।

আমার এই কামরায় একমাত্র বিলাসসামগ্রী উপভোগের সিদ্ধান্ত নিলাম। রিমোটটা চেপে টেলিভিশন অন করলাম। দেখলাম সেখানে এই ভাইরাস কাহিনী ছাড়া আর কিছুই নেই। আমার মতো আইসোলেশনে থাকা কিছু লোককেও দেখলাম। কাচের দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে তারা কী করুণভাবেই না তাকিয়ে আছে কাঁচের ওপারে থাকা প্রিয়জনের মুখের দিকে।

এই করুণ চাহনির একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। অকৃত্রিমতার সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য উপভোগের মাধ্যমেই হয়তো আমি আমার জীবনের শেষটাকে উপভোগ করছি। এই অজ্ঞাতবাসের দিনগুলিই হয়তো আমার জীবননাট্যের শেষ অঙ্ক।

 

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

2 × five =

One Comment
scroll to top