বোধ অথবা অবসেশন


কারিন আশরাফ


পায়ের তলায় ঠাণ্ডা মেঝেকে ঠেলে পেছনে ফেলছি, কী যেন একটা ভাবতে গিয়ে শরীরের কোষগুলো সতর্ক হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু ভাবনাটা ধরতে পারছি না। কোটি কোটি নষ্ট চিন্তার আস্তাকুঁড়ে খুঁজছি সেই চিন্তাটা। কোথায়! অন্তত তার একটা নেমপ্লেট যদি থাকত। এভাবে অজস্র মিনিট আর সেকেন্ড আমি খুঁজতে থাকি, আর একসময় তাকে পেয়ে যাই৷

কী সুন্দর। তার নাম আমি জানি না, তবু যেন ছুঁয়েই চিনে ফেললাম। তাকে শক্ত করে ধরে ছুটতে থাকি, নোংরা ভাবনাগুলো যেন আমাকে জাপটে ধরতে না পারে। বোনের ধাক্কায় জেগে উঠলাম, নাকি ঘুমিয়ে পড়লাম যেন। ওকে দেখে হঠাৎ এত ভাল লাগল। আমি নাম পেয়ে গেছি, যার নাম এত এত শতাব্দী ধরে আমার মস্তিষ্ক খুঁজে গেছে অহর্নিশ।
”মুনিয়া, শোন আমার বাচ্চা হবে!” চিৎকার করে উঠি আমি আনন্দে৷ আমার বোন আমার কথায় উঠে বসে, ওর মুখে সূক্ষ্ম দুশ্চিন্তার ছাপ দেখতে পাই। ওর মুখ থেকে কথা বের হয়ে আসছে, অস্ফুট – বুঝতে পারি না।

ওকে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যাই রাস্তায়। সাবধানে, জীবনকে জীবনের কাছ থেকে রক্ষা করে আমি এগিয়ে যাই। স্কুলের পথটা ছোট, আরো ধীরে হাঁটি। পৃথিবীকে নিজের গর্বে চূর্ণ করে দিই। এখন সন্ধ্যাবেলা, এইমাত্র সূর্যকে পাঁজকোলা করে মেঘ গিলে ফেলল, একটা দুটো রিকশা টিংটিং শব্দে বাতাসে কাঁপন ধরাচ্ছে৷ আমি হেঁটে চলি শহরের বায়োস্কোপে, উৎসুক দর্শককে নতুন শো উপহার দিতে। মায়া লেখা হতে থাকে পিচের উপরে খালিপায়ের প্রতিটি পদক্ষেপে।

স্কুলটা একদম গিজগিজ করছে। আমি আমার ক্লাসে চলে যাই। আমার ক্লাসে, অথবা অন্য কারো ক্লাসে। ম্যাডাম ক্লাস নিচ্ছে বোধহয়, তা নেক, আমি ঢুকে পড়লাম। এখানে আমার সব বন্ধুরা। তারা আমাকে দেখল। কয়েকজন হাত নাড়ল, কেউ আমাকে তাদের পাশে বসতে বলল। আর কয়েকজন দেখেও না দেখার ভান করল। ওগুলো বজ্জাতের হাড্ডি। হিংসে করছে আমাকে। আমি ওদের সবাইকে বললাম – কানে কানে, লিখে লিখে। ওরা কিন্তু মুনিয়ার মতো ভয় পেয়ে যায় নি।

”কংগ্র‍্যাচুলেশনস্।” ভাবলেশহীন মুখে ওরা বলে৷ আমি শুনি আর বিজলি চমকাতে থাকে আমার ভিসেরাতে।

”এখানে তাহসিন নেই…তাহসিন কোথায়?” আমি ফিসফিস করে জানতে চাই আমার আরেকটি বন্ধুর কথা। ছেলেমেয়েগুলো কলের পুতুলের মত একসাথে বিবৃতি দিল যে তাহসিনের ঠিকানা এখন দোতলায়। কেন সে আলাদা? আমি অবশ্য তা জিজ্ঞেস করলাম না।

কখন ওর ক্লাসে পৌঁছেছি জানি না। আমাকে দেখে অবাক হয়ে আমার দিকে ও তাকাল। আমি বললাম, ”এই জানিস, আমার বাচ্চা হবে?” তাহসিন এখনো কিছুই বলছে না। অবিশ্বাস ওর চোখ থেকে চুইয়ে পড়ছে। আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে বললাম, “তুমি খুশি হও নি, তাই না?” এতক্ষণে মুখটা খুলল, অবশ্যই অনেক অনেক খুশি আমি তোর জন্য। ”মুনিয়া আমার কথা বিশ্বাস করে না, আর তুইও করলি না…” বলতে বলতে অভিমানে গাল ফুলে যায় আমার। ওর সাথে আরো কী কী কথা হচ্ছিল ঝাপসা ঝাপসা, তখন পুরো বিল্ডিং কাঁপতে শুরু করল। দেখলাম নায়না দৌড়ে আসছে। ওর ছোট্ট পায়ের দৌড়ে সবকিছু কেন ভেঙে পড়ছে?

”দৌড়াও!” চ্যাঁচাচ্ছে কেন মেয়েটা বুঝতে পারছি না। হয়তো মৃত্যু জান্তব থাবা নিয়ে এগিয়ে আসছে। আমি দৌঁড়ে গেলাম রেলিঙের একপ্রান্তে ঝোলানো শামিয়ানার কাছে। শামিয়ানার উপরে বরফ-স্কেট করে রেলিঙের অন্য প্রান্তে চলে গেলাম। দেহে আকস্মিক এ্যাড্রেনালিন-ধারা আমাকে শামিয়ানা তো পার করিয়ে দিল ঠিকই, কিন্তু ক্লান্ত করে দিয়ে গেল। চারদিকে সবার মুখ কেমন ম্রিয়মাণ এখন। একেকজন মানুষের দুর্বোধ্য মনের নাটবল্টুগুলো বুঝে উঠতে সবসময়ই আমাকে বেগ পেতে হয়েছে। বোধহয় মৃত্যুর খুব কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষগুলো নতুন করে জীবন নিয়ে চিন্তায় মগ্ন। ক্লান্ত আমাকে টেনে নিয়ে চলে আমার দুটো পা, ও দুটোর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকি, আশ্চর্য এত খাড়া সিঁড়ি! আমার মধ্যে আবার সেই পাথরের যাঁতাকলটা ঘুরতে শুরু করে, মনে করিয়ে দেয় আমাকে—আমার যে বাচ্চা হবে। নতুন করে পাওয়া পুরোনো চিন্তাটাকে আবার উলের মতো বুনতে শুরু করি। বারবার পেঁচিয়ে যায়, বারবার তাকে মুক্ত করি।

“আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
আমি তারে পারি না এড়াতে,
সে আমার হাত রাখে হাতে,
সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,
সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়
শূন্য মনে হয়,
শূন্য মনে-”

তরবারির ফলা চোখ ধাঁধিয়ে দেয় আমার, ভেঙে ফেলে চিন্তার কাচঘর। তরবারি না, এ তো আমার হেডটিচার। ”ম্যাম, আসসালামু আলাইকুম,” আমি এগিয়ে যাই তাঁর কাছে। আরেকটা চিন্তা তখন ম্যামের চোখের ভেতর থেকে আমার মধ্যে সমান্তরালে জায়গা নিল, তারপর আমাকে সঁপে নিতে শুরু করল। হ্যাঁ, ভুল তো কিছু না, হেডটিচার যদি আমার কথা জানতে পারেন… আমাকে তো এক্সপেল করা হবে।

না, না — আমি ওটা সহ্য করতে পারব না। সমাজ থেকে যতই পালাতে চাই, ততই কঠিনভাবে সে কেন আমাকে জড়িয়ে ধরে? নাহয় আমার বাচ্চা হবে, এজন্য আমাকে কেন বের করে দিচ্ছে ওরা? রুদ্ধশ্বাসে আমি ছুটতে থাকি, রাগী চোখে ম্যাডাম আমাকে দেখছেন আর পেছনে সরে যাচ্ছেন। আমি বেরিয়ে যাই স্কুল থেকে।

এখন বিকেল। মরা সোনালি রোদে সস্তা ঢাকাকে বেশ দামি মনে হয়। জোনাকির আলোর মতো হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়িগুলো গর্জন করতে করতে চলে যায়। রোদের মধ্যে বেড়ালের পায়ের আওয়াজে বৃষ্টির ব্লেডগুলো আমাকে ভিজিয়ে দেয়, আর আমি পা বাড়াই এবার অন্য কোন সময়ে।

 


কারিন আশরাফ ভালোবাসে পড়তে ও লিখতে। ছোটগল্প তার কাছে অন্য মাত্রার জগতে উঁকি মারার জানালা। সে মাঝে মাঝে লেখালেখি নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে চেষ্টা করে৷

2 Comments

  1. সত্যিই খুব চমৎকার ও ভিন্নধর্মী লেখা পড়লাম।এরকম গতানুগতিক ধারার বাইরে আরও লেখনী আশা করছি আপনার কাছে ভবিষ্যতে।আর লেখনীর মাঝে ব্যবহৃত মেটাফোরগুলো ব্যক্তিগতভাবে খুবই ভালো লেগেছে,যেমন বেড়ালের পায়ের আওয়াজের মধ্য দিয়ে বৃষ্টির ফোটাকে ব্লেড এর সাথে তুলনা করে নিজের জীবনের লুকোনো কস্টগুলোকে সবার সামনে উপস্থাপনটা যেন অনন্য মাত্রার ছিল। by the way লেখকের কাছে একটা প্রশ্ন রইল যে,শেষের লাইনটা দ্বারা কি মেয়েটির আত্নহত্যাকে বুঝানো হয়েছে? আর বেড়ালের পায়ের আওয়াজে বৃষ্টির ব্লেড কি গল্পের মূল চরিত্রের জীবনের অজানা কস্টকেই বুঝাচ্ছে মানে আমি কি ঐ লাইনটার সঠিক ব্যাখ্যা করতে পেরেছি?

  2. অনেক সুন্দর হয়েছে পিয়েতা। বহুদিন পর এমন কোনো লেখা পড়লাম।ওই রাস্তাটিকে এত সুন্দর ভাবে, অন্যরকম ভাবে প্রকাশ করেছ, ফুটিয়ে তুলেছ। আমাকে ভাবাচ্ছে এটাই। আশা করি আরো লেখা পাব তোমার কাছ থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

2 Comments
scroll to top