লকডাউনের ইদ ও দুটি অণুগল্প


আদনান সহিদ


ইদ সালামি

 

রায়ানের মন অসম্ভব খারাপ। ইদের দিন হলেও আজ বাইরে বেড়ানো যাবে না। করোনাভাইরাসে অনেক মানুষ আক্রান্ত, অনেকে মারা যাচ্ছে। এজন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ঘরেই থাকতে হবে। কারো হাত-পা, গা ছোঁয়া যাবে না।

রায়ান দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। দু’মাস ধরে স্কুল বন্ধ।বন্ধুদের সাথেও দেখা নেই, খেলা হয় না। আজও হবে না।

রায়ানের আজ সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে ছোটচাচার জন্য। ছোটচাচা ওদের বাসায় থাকেন। অসম্ভব আদর করেন তাকে। ইদের দিন ঘুরতে নিয়ে যান। রেস্টুরেন্টে খাওয়ান, খেলনা কিনে দেন। চাচা-ভাতিজা সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরে। এবার তা হবে না তিনদিন হল ছোটচাচার করোনা ধরা পড়েছে। হাসপাতালে একটা ঘরে আলাদা রাখা হয়েছে তাকে।

হঠাৎ মায়ের গলা শুনল রায়ান, “রায়ান বাবু, কোথায়? ছোটচাচার ফোন এসেছে।” 

নিমিষেই মন ভালো হয়ে গেল রায়ানের। ছোটচাচা হাসপাতাল থেকে রায়ানকে ভিডিও কল করেছেন ইদের দিন বলে।

”কী রে পাগলা! কেমন আছিস?”

”ভালো আছি। ছোটচাচা, এখনও বিছানায় শুয়ে আছো কেন? নামাজ পড়তে যাবে না?”

”হাসপাতালে কি ইদের নামাজ পড়া যায় রে পাগলা?” হাহা করে হেসে ওঠেন ছোটচাচা। তারপর বলেন, “শোন, তোর ইদ সালামি নিবি না?” 

রায়ানের চোখ চকচক করে ওঠে। চেঁচিয়ে ওঠে, ”কই ছোটচাচা? এক্ষুনি দাও। কিন্তু তোমাকে সালাম করব কীভাবে?”

”সালাম করতে চাস? দাঁড়া।” ছোটচাচা মোবাইলের স্ক্রিনটা পায়ের কাছে নিয়ে আসে।

”পা দেখছিস? নে, এবার সালাম কর।”

রায়ান খুব মজা পেয়ে যায়। সে পাঁচ-ছয় বার মোবাইল স্ক্রিনে ছোটচাচার পায়ে সালাম করে। তারপর বলে ওঠে, ”সালামি দাও, ছোটচাচা‌।”

”দাঁড়া, দিচ্ছি।” ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে রাখা নতুন চকচকে ২০০ টাকার একটা নোট রায়ানকে মেসেঞ্জারে পাঠান ছোটচাচা।

একটু পর কল করে বলেন, ”কিরে সালামি পেয়েছিস?”

”২০০ টাকার নোট!” রায়ান উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, ”কিন্তু আমি কীভাবে এটা খরচ করব? এটা তো মোবাইলের ভেতরে।”

“তুই ও তো আমাকে মোবাইলের ভেতরেই পায়ে সালাম করেছিস সোনা!” ছোটচাচা হেসে ওঠে।

রায়ান যারপরনাই আনন্দ পেয়েছে। দারুণ ব্যাপার তো!কারো পায়ে হাত না ছুঁয়েও সালামি পাওয়া যাচ্ছে। এক ছুটে মায়ের কাছে চলে যায় সে। গ্রামের বাড়িতে নানা-নানীর কাছে সালামি চাইবে। সালামও করবে মোবাইলে।

পেছনে মোবাইল স্ক্রিনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ছোটচাচা। হঠাৎ আবিষ্কার করেন তারও আনন্দ হচ্ছে। তিনি রায়ানকে ইদের সালামি দিতে পেরেছেন।

 


খাবার টেবিলে ইদ

 

ইদের দিন সকালে টেবিলে খাবার পরিবেশন করছে রিয়া। সারা দিন-রাত ধরে ছয়-সাত পদের রান্না করেছে। বিয়ের পর এটাই রিয়ার প্রথম ইদ আর ইদের রান্নাও। তাই বেশ পুলকিত সে।

রুদ্র এখনো ঘুমাচ্ছে। গত রাতে রিয়াকে রান্নায় সাহায্য করে আগেভাগেই ঘুমিয়ে গেছে। রিয়াও সকালে ডাকে নি ইচ্ছে করেই। টেবিল সাজিয়ে ডেকে এনে একটা সারপ্রাইজ দিতে চায়।

লকডাউনের কারণে এবার রিয়া-রুদ্রের গৃহবন্দি ইদ কাটবে। রিয়ার মায়ের বাসা ঢাকায় হলেও করোনা-সচেতন রিয়া সেখানে যাচ্ছে না। অথচ বিয়ের আগে মাকে ছাড়া একদিনও টেবিলে বসে খায় নি সে। বিয়ের পরও সপ্তাহান্তে রুদ্রসহ মায়ের বাসায় গিয়ে খায়। রিয়ার শ্বশুরবাড়িও ঢাকা থেকে ঘণ্টা দুয়েকের দূরত্ব। রুদ্র ভীষণ মা ভক্ত। প্রতিমাসে রিয়াকে নিয়ে নিজ মায়ের সাথে সময় কাটানো তারও নিয়মমাফিক-ই হয়ে গেছে। দুজনেরই বাবা না থাকায় মা-ই তাদের সর্বেসর্বা।

ঘুম থেকে উঠে মুখ না ধুয়েই সোজা টেবিলে বসে পড়লো রুদ্র। 

”আরে! এত্ত কিছু করেছ সারা রাত? এসো, তাড়াতাড়ি বসে পড়।”

রিয়া রুদ্রের পাশে বসতে গিয়েও বসল না। মুখোমুখি চেয়ারটায় বসল। রুদ্র তার চেয়ারে বসে পাশের খালি চেয়ারটা টানল। নিজ হাতে প্লেটে খাবার বেড়ে সেখানে রাখল। তারপর রিয়ার বেড়ে দেওয়া প্লেটে খাবার খেতে শুরু করল।

রিয়া একটুও অবাক হল না। সে জানে,তার মতোই রুদ্রের তার মাকে খুব মনে পড়ছে। সেও রুদ্রকে অনুসরণ করল। পাশের খালি চেয়ারটা টেনে সেখানে প্লেটে খাবার বেড়ে দিল। এরপর নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দিল। 

খাবার টেবিলে মায়ের উপস্থিতি ছাড়া খাবার ভাল লাগে না। তাই ওরা ইদের দিন মাকে ছাড়া খাবে না, আর খাচ্ছেও না।

 


আদনান সহিদ লিখতে অণব ভালোবাসেন। শব্দেরা তার অকৃত্রিম বন্ধু, তার হয়েই কথা বলে। পাঠকেরা সে কথামালায় যোগ দিলে এক ‘আনন্দমেলা’ তৈরি হয় বলে তাঁর বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top