রবীন্দ্রনাথের বলাই


আদনান সহিদ


আমাদের রবিঠাকুর বরাবরই খুব প্রকৃতিপ্রেমিক। সেটা তাঁর প্রেমের গান হোক, কিংবা ছোটগল্পের বলাই, প্রকৃতিকে তিনি বারবারই টেনে এনেছেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে। কখনো প্রিয়তমার জন্য বেঁধে রেখে দিয়েছেন তাঁর মল্লিকা বনে-র অঞ্জলি, আবার কখনো কিশোর ছেলের প্রকৃতিপ্রেম এনে প্রমাণ করেছেন, সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ আর প্রকৃতি যেন হরিহর আত্মা। প্রেম হোক কিংবা শৈশবের দুষ্টুমি, মানুষের জীবনে প্রকৃতি যে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটা তাঁর রচনা পড়লে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু এখন? মহীনের ঘোড়াগুলি গানটি শুনেছেন না, যেখানে পৃথিবীটা ছোট হয়ে স্যাটেলাইট আর টেলিভিশনে বদ্ধ হয়ে গেছে? আমার কাছে বর্তমান পৃথিবীটাকে আসলে তাই মনে হয়। পার্থক্য শুধু মহীনের ঘোড়াগুলি গৌতম চট্টোপাধ্যায় যখন এই গান লিখেছিলেন, তখন বোকা বাক্স হিসেবে শুধু টেলিভিশনকে বোঝানো হত। আর এখন মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন বলেন কিংবা গান শোনার এমপি-থ্রি এবং আইপড, প্রতিটি তো আসলে সেই গৌতমের বোকা বাক্সতেই পরিণত। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে আমরা এতটাই ব্যস্ত যে প্রকৃতির সাথে কবে আমাদের আত্মিক বিচ্ছেদ ঘটে গেছে, আমরা বুঝতেও পারি নি। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বলাই ছোটগল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি আসলে আমাদের মধ্যেই বসবাস করে। এই গল্প থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতিপ্রেমের বীজটা আসলে আমাদের মধ্যে শৈশব থেকেই রোপণ করা প্রয়োজন। তাহলে আজকের পৃথিবীর ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ হোক আর ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’, কোনটা নিয়েই গ্রেটা থানবার্গকে কাঁদতে হত না। 

শিশু বলাইয়ের প্রকৃতি প্রেমটা সহজাত। এখন কিছুটা অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু বাড়ির আশেপাশের ঘাস-লতাপাতাগুল্মই ছিল বলাইয়ের শৈশবের প্রথম বন্ধু, খেলার সাথী। সেটা কেন, তা বুঝতে হলে আমাদের বলাইয়ের চরিত্রকে কিছুটা বিশ্লেষণ করতে হবে। মা-বাবাহীন বলাইয়ের গড়ে উঠাটা যে অন্য দশটি কিশোরের মতো হয় নি, সেটা গল্পে সরাসরি লেখা না থাকলেও আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। এই অন্যরকম বড় হওয়া বলাইকে পাঠিয়ে দেয় প্রকৃতির কাছে। নিঃসঙ্গ বলাই প্রকৃতির মাঝে খুঁজে পায় তার চরম বন্ধু। যাকে সকল দুঃখ-কষ্ট বলা যায়, এবং প্রতিদানে বন্ধু প্রকৃতি দারুণ মমতায় হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। ঘাসের মাঝে বেগুনি হলদে নাম-না-জানা ফুলগুলো যেন তার একান্ত নিজস্ব দুঃখের ফুল হিসেবে ফুটেছে।  

নির্মল ও নির্মোহ এক প্রাকৃতিক পরিবেশে বলাই গাছগাছালির সাথে সময় পার করে। সবুজ ঘাসের মাঝে গড়াতে গড়াতে তার সুঁড়সুঁড়ি লাগা এবং খিলখিল করে হেসে ওঠা আসলে মুক্ত শৈশব ও আনন্দের প্রতীক হিসেবেই ধরা দেয় আমাদের সামনে। যেটা এই ইট-কাঠ-কংক্রিটের প্রাসাদে বেড়ে উঠা শিশুদের নেই। হয়তো আছে, ইন্টারনেটে সামাজিক মাধ্যমের বিশাল মুক্ত পৃথিবী তাদের আছে, সেটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এই পৃথিবীতে তাদের ব্যস্ততা যে ঠিক বাড়ির বারান্দায় টবে ফুটে উঠা চন্দ্রমল্লিকার থেকে তাদের চোখ সরিয়ে নিচ্ছে, সেটাও স্বীকার করে নেয়াই ভাল। 

অবশ্য তাদের-ই বা দোষ কোথায়? তারা তো বলাইয়ের মতো এই বৃহত্তর প্রকৃতির রূপ দেখতে পায় নি। ইউটিউবে পেপা পিগ বা শিনচ্যান দেখার আনন্দ কি বলাইয়ের এই নির্মল আনন্দের সাথে তুলনীয়? এই প্রশ্নের জবাব হয়তো আমরা কখনোই পাব না। 

বলাই তার আশেপাশের প্রকৃতি ও গাছপালার সাথে নিজেকে সব সময় ওতপ্রোত জড়িয়ে রাখে। তাদের আলিঙ্গন করে, নিয়মিত গল্পে ও কথোপকথনে মেতে ওঠে। 

প্রতিদিন ঝুঁকে পড়ে পড়ে তাদেরকে যেন জিজ্ঞাসা করে, ‘তার পরে? তার পরে? তার পরে?’ তারা ওর চির-অসমাপ্ত গল্প।

আর তাই হয়তো সদ্য গজানো কচি পাতাও প্রগাঢ় মমতায় বলাই কে পাল্টা প্রশ্ন করে:

তোমার নাম কী?’অথবা তোমার মা কোথায় গেল?” 

আমার মা তো নেই – বলাইয়ের এ প্রত্যুত্তর বিষাদমাখা হলেও একটা পরম আশ্রয় সে ঠিকই খুঁজে নেয় গাছগাছালির বুকে। প্রকৃতির অপার পরিবর্তনেও বলাইয়ের ঘন রঙ লাগা‘ মন আপন মনে কথা বলে উঠতে চায়। কখনো কখনো বৃষ্টিও হয়ে যেত ওর একান্ত অনুভূতির নিবিড় শ্রোতা। ঘনকালো মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশ থেকে ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টির শব্দ শুনতে পেত‌ বলাইয়ের সমস্ত গা যেন।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে এখন আমাদের শিশুরা একা না হয়েও একাকিত্বে ভুগছে। চাকরি নিয়ে আমাদের বাবা-মা’রা যখন ব্যস্ত থাকছেন, তখন আমাদের শিশুরা ঝুঁকে পড়ছে গ্যাজেট এবং ইন্টারনেট আসক্তির দিকে। খেলাধুলার জায়গা নেই, আগের মতো অনেকগুলো শিশুর একসাথে বড় হয়ে উঠা নেই – আমাদের এই সময়ের শিশুরাও কিন্তু বলাইয়ের মতোই একা। 

বলাই তার বন্ধু হিসেবে খুঁজে নিয়েছিল প্রকৃতিকে, আমাদের শিশুরা সেই অভাব পূরণ করে ইন্টারনেটে টকিং টম খেলে। এই গ্যাজেট তাদের প্রকৃত সঙ্গী হয়ে উঠতে পারছে কিনা, পারলেও সেটা তাদের ক্ষতি করে বসছে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন প্রায় প্রয়োজনীয়তায় পরিণত। বলাই তো গাছের ভেতরের জীবিত মানুষটিকে তার সঙ্গী হিসেবে খুঁজে নিয়েছিল। বিশাল প্রকৃতির মাঝে তো প্রাণের অভাব নেই, তাই বলাইয়ের সঙ্গীরও অভাব হয় নি। 

কিন্তু আমাদের শিশুরা কি বৃষ্টির শব্দ শুনে? সিক্ত হয়ে ওঠার সুযোগ কি পায় তাদের আনন্দিত মন ও মনন? কম্পিউটারের ভেতর নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমে চলা কয়েকটি চরিত্র কি তাদের বন্ধুর অভাব পূরণ করতে পারে? 

উত্তরটি না-ই হওয়ার কথা। শিশুরা চারপাশের পরিবেশ থেকে মানবিক নানা গুণাবলি দ্রুততার সাথে শিখে ফেলে। তারা জন্ম দেখে, গড়ে উঠা দেখে, মৃত্যু দেখে। তারা প্রকৃতির মাঝে জীবন দেখে। যেই জীবন কম্পিউটারে নেই। 

বলাইও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তার ভেতরে দরদ, প্রেম ও ভালোবাসার আবির্ভাব ঘটিয়েছিল তার সবুজ বন্ধুরাই। কেউ গাছের ফুল তুলে নিলে, কিংবা তার সাথীরা গাছের আমলকি ছিড়ে নিলে তার খারাপ লাগত। এই মানবিকতা প্রকৃতির মাঝে থেকেই সে শিখেছে। গাছপালা অন্ত:প্রাণ বলাইয়ের সমবয়সী বন্ধুরা চলাচলের মাঝে ফসকরে বকুল গাছের একটা ডাল ভাঙলে বা গাছে ঢিল মারলে বলাইয়ের কান্না লুকানোর আপ্রাণ চেষ্টা আদতে তো প্রবল বৃক্ষপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।

ঘাসের মধ্যে জড়িয়ে থাকা রঙ-বেরঙের বাহারি ঘাসফুল ও ছোট্ট লতাপাতাসহ চারাগাছগুলো যখন ঘাসুড়েরা কাটতে যেত, বলাই তখন আর নিশ্চুপ থাকতে পারত না। তাদের উদ্ধারকর্তা হয়ে কোমল প্রতিবাদ জানাত কাকির কাছে: 

ওই ঘাসিয়ারাকে বলো-না, আমার ওই গাছগুলো যেন না কাটে।

নতুন গাছের সজীব উত্থানে বলাইয়ের উৎসাহের সীমা ছাড়াতো। রাস্তার মাঝে গজিয়ে ওঠা শিমুলগাছের চারাকে সযত্নে লালন পালন করে বাড়তে দেয়া ছিলো তার প্রাণের এক প্রকল্প। উৎপাত মনে করে সেই প্রকল্পের ইতি টানতে গেলে তাই তো বলাইয়ের আর্তচিৎকার শোনেন তার কাকা: 

না, কাকা, তোমার দুটি পায়ে পড়ি, উপড়ে ফেলো না।

বলাইয়ের সেই প্রকল্প, সেই উৎসাহের কি কখনো সমাপ্তি হয় আসলে? হয় না। তা‌ই তো সবুজ সাথী ও প্রকৃতিকে ছেড়ে দূর দূরান্তে শিক্ষার উদ্দেশ্যে গিয়েও বলাই তার কাকিকে চিঠি দেয় : 

কাকি, আমার সেই শিমুলগাছের একটা ফোটোগ্রাফ পাঠিয়ে দাও।

আমাদের শিশুরা কি বাঁচিয়ে তুলতে চায় তাদের কম্পিউটার গেমের চরিত্রকে? মানবিকতার এই আর্তনাদ কি আমরা শুনতে পাই তাদের মাঝে?

 

বোধহয় না। 

 


আদনান সহিদ লিখতে অণব ভালোবাসেন। শব্দেরা তার অকৃত্রিম বন্ধু, তার হয়েই কথা বলে। পাঠকেরা সে কথামালায় যোগ দিলে এক ‘আনন্দমেলা’ তৈরি হয় বলে তাঁর বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top