Close

Unlearning Gender-based Fallacies

আমরা অনেক সময় প্রচুর শব্দ ব্যবহার করি, যেগুলোর অর্থ সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। আবার অনেক শব্দের অর্থ ভালোমতো না জেনে তাকে অন্য অর্থে ব্যবহার করি। ফলে না জেনেই কিছু শব্দের ভুল ব্যবহার করি এবং সেই ভুল ছড়িয়ে দিতে থাকি সর্বত্র।

এটার পিছনে অবশ্য আমাদের সমাজে প্রচলিত বিশ্বাসের ভুল শিক্ষা-ই দায়ী। এই যে আমরা ‘হিজড়া’ বলে যাদের চিনি, যাদের বোঝাই, যাদের ডাকি, সেটাও আসলে ভুল। এটাও আমাদের সমাজের প্রচলিত ভুল শিক্ষাগুলোর-ই একটি।

আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই হয়তো জানে না যে ‘হিজড়া’ আসলে কোনো মানুষের লিঙ্গকে বোঝায় না। মানুষ যেমন পুরুষ বা নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করে, কেউ আসলে ‘হিজড়া’ হয়ে জন্ম নেয় না, এটি কারো লিঙ্গ নয়। ‘হিজড়া’ শব্দের মূল অর্থ হিসেবে আসলে একটা পেশাকে বোঝানো হতো। আমাদের চারপাশে যারা ‘হিজড়াগিরি’ করে অর্থ উপার্জন করতো, তাদেরকে ডাকা হতো ‘হিজড়া’ নামে, তাদের পেশাগত পরিচয় হিসেবে। ‘হিজড়াগিরি’ বলতে হিজড়াদের নাচ গান করে, হাততালি দিয়ে, শিশুদের আশীর্বাদ করে জীবিকা নির্বাহের বৃত্তিকে বোঝানো হতো। তাই ‘হিজড়া’ শব্দটি আসলে একজন মানুষের পেশাগত পরিচয় প্রকাশ করে, লিঙ্গ পরিচয় নয়।

এই শব্দটির মূল অর্থ একটি পেশাকে বোঝালেও এখন বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে এই শব্দটি একটি কমিউনিটিকে বোঝায়। কমিউনিটির বাংলা অর্থ সম্প্রদায়। মূলত আগে যারা ‘হিজড়াগিরি’ করে অর্থ উপার্জন করতো, তাদের সম্প্রদায়কে হিজড়া সম্প্রদায় বলা হলেও এখন এই কমিউনিটির মাঝে এমন অনেক মানুষও আছে, যারা কখনোই ‘হিজড়াগিরি’ করেন নি। এখন অনেক লিঙ্গ পরিচয়ের অনেক মানুষ এই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।

হিজড়া বলতে এখন আসলে এমন একটি কমিউনিটিকে বোঝানো হয়, যেখানে পুরুষ এবং নারী ছাড়া অন্য সব লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ একইসাথে অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশে এই কমিউনিটির মানুষগুলো এতটাই অধিকারবঞ্চিত অবস্থায় থাকেন যে এখন এই কমিউনিটির পরিচয়-ই তাদের মূল পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

এখনকার বাস্তবতায়, ট্রান্সজেন্ডার বা রূপান্তরকামী, ইন্টারসেক্স বা আন্তঃলিঙ্গ এবং খোজাকৃত পুরুষরাও এই হিজড়া কমিউনিটির অন্তর্ভুক্ত। এই ট্রান্সজেন্ডার বা ইন্টারসেক্স শব্দগুলো একজন মানুষের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করে, কিন্তু হিজড়া শব্দটিকে কোনোভাবেই কারো লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এটি ভুল।

অনেকে বলতে পারেন – এতে আর এমন কী হয়েছে, হিজড়া বললেই তো সবাইকে বোঝানো হয়। আমাদের বুঝতে হবে যে একজন মানুষের নানা ধরনের পরিচয় আছে। এবং প্রতিটি মানুষের পরিচয় বা তার আইডেন্টিটি খুবই সেনসিটিভ বা সংবেদনশীল একটি বিষয়। আমি একজন ‘নারী’ এবং আমি একজন ‘লেখক’। একটি আমার লিঙ্গ পরিচয়, আরেকটি আমার পেশাগত পরিচয়। কেউ যদি সেটা মিলিয়ে ফেলে, আপনার আমার যেমন খারাপ লাগবে, ঠিক আমাদের চারপাশে যেই হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ আছে, তাদেরও খারাপ লাগাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে, তাদের পরিচয়ের বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ বহু বছর ধরে এই দেশে তাদেরকে কোনো আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয় নি। দক্ষিণ এশিয়ায় তারা প্রায় সবসময়ই অধিকারবঞ্চিত অবস্থায় বসবাস করেছে।

হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা এক এক জন এক এক বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিয়েছেন। হিজড়া বলে আখ্যায়িত করা শ্রেণির মানুষদের মধ্যেও খুবই সহজ এবং খুবই স্পষ্ট কিছু পার্থক্য আছে।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের সরকারি গ্যাজেটেও এই মানুষগুলোর লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে হিজড়া শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলা একাডেমির অভিধানেও হিজড়া শব্দটি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সমাজের প্রতিটি স্তরেই এই শব্দের ভুল ব্যবহার এতটাই বহুল প্রচলিত যে সেটা আমাদের অভিধান এবং সংবিধানেও ঢুকে গেছে। এই ভুল কোনোভাবেই কাম্য নয়।

‘ট্রান্সসেক্স’, ‘ইন্টারসেক্স’, ‘ট্রান্সজেন্ডার’ – এই শব্দগুলো সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখাটা মানুষ হিসেবে আমাদের সকলের প্রথম সারির দায়িত্বগুলোর একটি। অনেক দেরি হয়ে গেছে, এখন এই বিষয়গুলো নিয়ে স্পষ্ট জ্ঞান থাকাটা জরুরি দরকারে পরিণত হয়েছে।

জেনে নেয়া যাক আমাদের চেনা এই হিজড়ারা কারা, এই হিজড়ারা কেন তৃতীয় লিঙ্গ এবং এই হিজড়াদের থাকা শ্রেণিবিভাগগুলো:

ট্রান্সজেন্ডার:

ট্রান্সজেন্ডার শব্দটির সহজ বাংলা হচ্ছে রূপান্তরকামী। এ শ্রেণির মানুষেরা তাদের দৈহিক লিঙ্গের রূপের সাথে তাদের মনোলিঙ্গের রূপের সাদৃশ্য খুঁজে পান না। তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য তাদের মানসিক বৈশিষ্ট্যের থেকে আলাদা হয়ে থাকে।

যেমন কেউ কেউ শারীরিকভাবে পুরুষ হয়ে জন্ম নিলেও তার মানসিকভাবে নারী হয়ে জন্ম নেয়। নারীদের সকল বৈশিষ্ট্যই তাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। একইভাবে, কেউ কেউ শারীরিকভাবে নারী হয়ে জন্ম নিলেও, মানসিকভাবে পুরুষ হয়ে জন্ম নেয়। পুরুষদের সকল বৈশিষ্ট্য দেখা দেয় তাদের মাঝে।

ট্রান্সসেক্স:

ট্রান্সসেক্স শ্রেণির মানুষেরা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে ট্রান্সজেন্ডারদের মতোই হয়ে থাকেন। ট্রান্সজেন্ডার শ্রেণির ব্যাক্তিদের সাথে ট্রান্সসেক্স ব্যক্তিদের পার্থক্য একটা-ই: এ শ্রেণির ব্যক্তিরা সার্জারির মাধ্যমে তাদের শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যকার অমিলকে রূপান্তরের লক্ষ্যে এক সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

যদি তারা মানসিকভাবে নারী হয়ে জন্ম নেন, তাহলে সার্জারির মাধ্যমে শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো নারীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যে রূপান্তর করেন। একইভাবে, মানসিকভাবে পুরুষ হয়ে জন্ম নিলে তারা শারীরিকভাবেও পুরুষ হওয়ার জন্যে সার্জারি করেন।

এই ধরণের সার্জারিকে “Sex change surgery” কিংবা “Sex Reassignment surgery” বলা হয়ে থাকে।

ইন্টারসেক্স:

ইন্টারসেক্স শব্দটির বাংলা হচ্ছে আন্তঃলিঙ্গ। এটি হার্মাফ্রোডাইট (Hermaphrodite) শব্দের প্রতিশব্দ। আন্তঃলিঙ্গ শ্রেণির মানুষদের পূর্বে উভলিঙ্গ বলা হতো। কিন্তু এ উভলিঙ্গ শব্দটি নিয়ে পূর্বে অসংখ্য তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, এবং এটি এখন বিভ্রান্তিকর এবং অসম্মানজনক বলে বিবেচিত হয়। তাই এখন উভলিঙ্গ শব্দটি আর ব্যবহার করা হয় না।

মূলত গর্ভাবস্থায় ক্রোমোজোমের কিছু ত্রুটির কারণে কিছু শিশুর যৌনাঙ্গ দেখে তারা নারী না পুরুষ এটি সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু বোঝা যায় না। এরকম শিশুদেরকে ইন্টারসেক্স কিংবা আন্তঃলিঙ্গ শিশু বলা হয়। ইন্টারসেক্স ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে আবার নারী এবং পুরুষ উভয় ধরনের যৌনাঙ্গ নিয়েই জন্ম নিয়ে থাকেন।

১৯ শতকের আগ পর্যন্ত আমরা ইন্টারসেক্স শ্রেণির মানুষদের “Herma” বলে জানতাম। তবে উক্ত শব্দটি মূলত উদ্ভিদ ও পশুপাখির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এক কথায় এই শব্দটি কোনো বস্তুকে ইঙ্গিত করে। তাই মানুষদের জন্যে “Herma” বলাটা ১৯ শতকে এসে বদলে দিয়ে ইন্টারসেক্স করা হয়।

দিনশেষে, এ জগতে বাহ্যিক পরিচয়ের কারণে মানুষকে মানুষ বলা। হাত-পা আলাদা, দু পায়ে দাঁড়ানো ঘন-লোমবিহীন যেকোন প্রাণিকেই আমরা মানুষ বলি হয়তো, তবে মানুষ আসলে তার বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা এবং মানবিক পরিচয়ের কারণে মানুষ।

সময় এসেছে সবার হাতের রঙিন পতাকা উত্তোলনের৷ সময় এসেছে বাহ্যিক চেহারা ও লিঙ্গের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষকে মানুষ বলে বিবেচনা করার।

সবার মনেই অনুভূতি আছে, সুখ আছে, আছে দুঃখ। আছে তীব্র বেদনা, আছে আলোর মতো চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া আলোড়ন জাগানো আনন্দের আন্দোলন। সে আপনার মতোই, আমার মতোই। সে আমাদের মতোই আদুরে।

একটু আদরে, আলিঙ্গনে, ভালোবাসায় তার চোখেও অশ্রু এসে যায়।

Adapted from Nusrat Risha Niti’s writeup

Read the original writeup here: https://drive.google.com/file/d/1brEnH0tAw4eJAD2w5YZTZqiE4uqLy2Gt/view?usp=drivesdk


This post was created in collaboration with TransEnd and ProjectDebi.

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

six + eighteen =

Leave a comment
scroll to top