কতদূর এগু‌লো মানুষ: ‌আল মাহমুদকে আমরা যেভাবে দেখি


সিগনারি ডেস্ক রিপোর্ট


“আম্মা বলেন পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসে না/ কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।”

 

এই কবিতার শেষ দুটো লাইন মাথার মধ্যে জলের মতো পাক খায় —

“তোমরা যখন শিখছো পড়া/ মানুষ হওয়ার জন্য,/ আমি না হয় পাখিই হবো,/ পাখির মতো বন্য।”

 

এই রকম করে কোনো কিশোর কি এখন ভাবতে পারে? নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু হয়তো মুখ খুলে বলতে পারে না। সমাজ তো তাকে সেই সুযোগ খুব একটা দেয় নি। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার করার পেছনে লেগেছে। ছোটবেলায় আর কারো না হোক, কিছু স্বাধীনচেতা কোমল হৃদয়কে একটা বাঁচার মন্ত্র দিয়েছে এই কবিতাটি। শিশু থেকে শুরু করে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া অবসরপ্রাপ্ত লোকটির জন্যে, কিংবা গাঁয়ের ক্ষেতে কাজ করা কৃষক — সবার জন্যই লিখেছেন কবি আল মাহমুদ।

মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ, যিনি আল মাহমুদ নামে অধিক পরিচিত, ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্‌ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে। ১৯৫০-এর দশকে যে কয়েকজন লেখক বাংলা ভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি, অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং পশ্চিম পাকিস্তান সরকার বিরোধী আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন তাদের মধ্যে মাহমুদ একজন। লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

১১ জুলাই, ২০২০, তার ৮৪তম জন্মদিনে বিএলএফের ফেইসবুক পেইজে লাইভে এসেছিলেন তিনজন শিক্ষক, যারা তাদের পুরোটা জীবন ধরেই কাজ করেছেন বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য নিয়ে। আল মাহমুদের জীবন এবং কবিতা নিয়ে বিএলএফের সাথে কথা বলেছেন নটর ডেম কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক ফয়সাল আজিজ, সেন্ট যোসেফ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক উজ্জ্বল সাহা এবং উন্মেষ ধর।

আলোচনায় উন্মেষ ধর বলেন,

“আল মাহমুদের যদি উপন্যাস পড়ি, গল্প পড়ি, প্রবন্ধগুচ্ছ পড়ি, তাহলে আমরা বুঝতে পারব তিনি কবি ছিলেন। আমি প্রস্তাব করি, আল মাহমুদকে কোন ভেদচিহ্ন দিয়ে পাঠ না করে কবিতার ডিসকোর্স-এর যে পঠন পদ্ধতি আছে, সেই মাফিক পাঠ করা উচিত। আর সেই মাফিক পাঠ করলেই আল মাহমুদকে সামগ্রিক অর্থে পাঠ করা হবে।”

আরও বলেছেন, ‘সোনালী কাবিন’ কবিতাগ্রন্থ‌টি দিয়ে আল মাহমুদকে স্বতন্ত্র করা যায়।” এবং “কবিতা হাজার দুয়ারি।”

বাংলা বিভা‌গের প্রভাষক উজ্জ্বল সাহা বলেন,

“কবিতার মধ্য দিয়েই আল মাহমুদ নিজ সত্তা ও আত্মপরিচয়কে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। মানুষ সবসময়ই শেকড় সন্ধানী। আল মাহমুদও তা নিজ কবিতার মধ্য দিয়ে করে গিয়েছেন।”

আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে নটর ডেম কলেজের প্রভাষক ফয়সাল আজিজ স্যার তার কন্ঠশিল্পের এক অসাধারণ প্রদর্শনী দিয়েছেন। আল মাহমুদের জেলগেটে দেখা, শেষ খেয়ার মাঝি, রবীন্দ্রনাথ  কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে তিনি আলোচনা সভাকে করেছেন প্রাণবন্ত।

আষাঢ়ের বৃষ্টিঘন অপরাহ্নে কবি আল মাহমুদের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ ল্যাঙ্গুয়েজ ফোরামের আয়োজিত আলোচনা পর্বটি ছিল মননশীল এবং দর্শকদের জন্য মনোরম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top