Close

করোনাকালের দুঃস্বপ্ন


তানভীর মৃদুল


একদম কাক ডাকা ভোর। যদিও কোনো কাক ডাকছে না। অনেকগুলো চড়ুই আর শালিক ডাকছে। তবু ভোরটি দেখে ‘কাক ডাকা ভোর’ কথাটাই মাথায় আসল প্রথমে। মনে হল, ঢাকা শহরে দিনে দিনে কাক কমে যাচ্ছে। এই করোনাকালীন সময়ে মানুষের অত্যাচার কমে যাওয়ার সুযোগে বিশ্বের নানা শহরে বিভিন্ন বনের পশুপাখি এবং কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ডলফিন ফিরে আসলেও, ঢাকা শহরে কাকের প্রতাপ ফিরে আসার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এমন একটা নিস্তরঙ্গ ছুটির ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে বসে থাকার কোনো মানে হয়?

নিজের চেহারায় বিরক্তি দেখতে না পেলেও পরিষ্কার আন্দাজ করতে পারছি। এই সময়ে কড়া টানে একটি সিগারেট ধরিয়ে ফ্রেমজুড়ে ধোঁয়া ছাড়তে পারলে ব্যাপারটি সিনেমাটিক হতো। কিছুদিন আগে সিগারেট ছেড়ে দেয়ায় সেটা করা যাচ্ছে না; তবে সদ্য দেখা ঘুম কাড়া স্বপ্নটাকে স্নায়ু চেপে ধরা সিনেমার দৃশ্যের মতোই লাগছে। কী একটা অস্বস্তি নিয়ে এখন এই ঘুমকাতুরে ভোরে তব্দা খেয়ে বসে আছি। স্বপ্নটা মনে করার চেষ্টা করলাম। 

আমাদের ঘরের ড্রইংরুমটা ছিল স্বপ্নে। কিন্তু কেন যেন ঘরটা খুব মলিন আর নিষ্প্রভ লাগছিল। আমি আর আমার ছোট ভাই তৈরি হচ্ছিলাম অফিস যাব বলে, মানে পিপিই পরছিলাম। পিপিই তো না, যেন স্পেসস্যুট। নানা স্তরের জামা। সাথে মাস্ক, হেলমেট, জুতা আর লম্বা গ্লাভস। দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ; কিন্তু সে অবস্থায়ই কাজকর্ম করতে হচ্ছে। এই গরমে এইসব জামা পরতে খুব হাঁসফাঁস লাগছিল, কিন্তু কিছু করার নাই। পিপিই পরে বের হলেও যে কাজ হবে তাও অনিশ্চিত। করোনা ভাইরাস এমনভাবে নিজেকে মিউটেট করছে যে এ পর্যন্ত কোন ওষুধই কাজে দেয় নি। আমার মতো অ্যাজমা রোগীদের বা অসুস্থ ও দুর্বল লোকদের জন্য ভাইরাসটি দিনে দিনে আরো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।  

 

আমরা তখন একটা বিশেষ গণপরিবহন সময় মতো ধরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। নিয়ম হয়েছে যে, কোথাও যেতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে সিকিউরিটি ও স্টেরিলাইজেশন ব্যবস্থাসহ নির্দিষ্ট কিছু পরিবহনেই যাতায়াত করবে বেশিরভাগ লোক। টিভিতেও শুনেছি সরকার থেকে বারবার এসব পরামর্শ আর সতর্কবার্তা দেয়া হচ্ছে। এভাবে যাতায়াত না করলে সংক্রমণের ভয়ের সাথে রাস্তায় ছিনতাই বা ডাকাতির ভয়ও প্রচুর। এছাড়া গ্যাস ও তেলের কঠিন সংকট; আমদানি হচ্ছে খুবই কম, তাই গাড়িও চলছে কম। ছোট ভাই তাড়া দিচ্ছিল কারণ যত দেরি হবে লাইন তত বড় হবে, আর তত বেশি সময় এই  জামা পরে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।

পিপিই পরতে পরতে ছোট ভাইকে বললাম, “তাড়াহুড়ো করলে চলবে না, বারবার তো বাইরে যাওয়া যাবে না। বাইরে কী কী কাজ সেটা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে প্রস্তুতি নিয়ে বের হতে হবে।” 

ও বলল, দুইটি পলিব্যাগে চারটি করে পানির গ্যালন প্যাক করে রেখেছে, আমি যেন আমার ব্যাগটি মনে করে নিই। অফিস থেকে ফেরার সময় ওই চার গ্যালন ভরে বিশুদ্ধ পানি ফকিরাপুল ওয়াসার পাম্প থেকে কিনে আনতে হবে। গতকাল থেকে এলাকায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না, ঢাকার বেশিরভাগ অঞ্চলেই কয়েক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা। বিদ্যুৎ মাঝে মাঝে আসে, গ্যাসও তাই। জরুরি পানির গাড়ি আসলে এখানে-সেখানে সেটি নিয়ে রোজই মারামারি লাগছে; যে কোনো দুর্বল মানুষের পক্ষে পানি নিয়ে বাসায় ফিরতে পারা কঠিন ব্যাপার। এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলতে বলতে ছোট ভাই রাগে গজগজ করছিল।

 

আমি ওকে বললাম, “আসল সমস্যাটা আমদানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের। বেশিরভাগ দেশ এতদিনে এই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় করে ফেলেছে। যে কয়টি দেশে এখনো এই ভাইরাসের সংক্রমণ আছে, সে কয়টি দেশের সাথে অন্যান্য অনেক দেশ-ই আমদানি-রপ্তানি, যাতায়াত ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করতে চাইছে না; নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই। যারা এখনো এসব যোগাযোগ বা বাণিজ্য বজায় রেখেছে, তাদের ব্যবস্থাগুলোও খুব সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়ে গেছে। এই ক্ষেত্রে অনেক দেশই আন্তর্জাতিক আইন কিংবা চুক্তির তোয়াক্কা করছে না।”

ছোট ভাই বলল, “এসব নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমিত দেশগুলোতে। দেশের অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে করোনা নিয়ন্ত্রণে আনার ব্যর্থতার ফলে অনেক ত্রাণদাতা দেশ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শোনা যাচ্ছে অনেক ধনী ব্যবসায়ী, বড় চাকুরে, মিডিয়া মোগল, বড় তারকা, খেলোয়াড়, সন্ত্রাসী, নেতা, সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ্যবান অনেকে অনেক খরচ করে, প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে চুপিচাপি জটিল নিরাপত্তামূলক নিয়মকানুন পার করে সপরিবারে সংক্রমণশূণ্য দেশে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন।” 

 

বেরুবার আগে টিভিটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখলাম, টিভিতে জরুরি নির্দেশনা প্রচার হতে যাচ্ছে।

“এই মুহূর্ত থেকে দেশে কারফিউ জারি হয়েছে। যে যেখানে আছেন, সেখানেই নিরাপদে অবস্থান করুন। সবাইকে ঘরবাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরবর্তী নির্দেশ প্রদানের আগ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। কেউ বাইরে বা রাস্তায় বের হতে পারবেন না। কিছু দুষ্কৃতকারী নাশকতা চালানোর চেষ্টা করছে, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তা শক্ত হাতে দমন করছে। কোথাও কোন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড দেখলে নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন করে জানান। কোন প্রকার গুজবে কান দিবেন না। ঘরে করোনা ভাইরাসের রোগী থাকলে তাকে আইসোলেশনে রাখুন এবং ঘরে ঘোরাফেরার সময়ে পিপিই ব্যবহার করুন। কোন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী মারা গেলে বাইরে ফেলে রাখবেন না, সাথে সাথে নির্দিষ্ট নাম্বারে ফোন করে জানান। কোন প্রকার গুজবে কান দিবেন না। জরুরী ফোন নাম্বারগুলো…”

 

নির্দেশনা শেষ হবার আগেই বিদ্যুৎ চলে গেল। নিষ্প্রভ ঘরটা আরও অন্ধকার এবং আরও নিষ্প্রভ হয়ে গেল যেন। বেশ কিছু পুলিশের গাড়ি অস্থিরভাবে সাইরেন বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে। কোথাও টায়ার বার্স্ট হল নাকি বোম? অস্থির হয়ে ফোন দিলাম এক সাংবাদিক বন্ধুকে। ফোন ব্যস্ত। ফোন দিলাম পুলিশে চাকরি করা বন্ধুটিকে। ফোন ব্যস্ত। আবার দিলাম ফোন সাংবাদিক বন্ধুকে। কেটে দিল। আবার পুলিশকে। ফোন ব্যস্ত। বন্ধুর বন্ধু এক স্বল্প পরিচিত নেতাকে ফোন দিয়েও ব্যস্ত পেলাম। হতাশ হয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে ফোন দিলাম কাছের এক বন্ধুকে। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলো কী হচ্ছে? তুই কিছু জানিস?”

“হ্যাঁ, জেনেছি কিছুটা, কিন্তু তোকে অস্থির মনে হচ্ছে। আগে মাথা ঠাণ্ডা কর।” 

“আমার মাথা ঠাণ্ডা আছে, বল।”

“সাউথ এশিয়ার চারটি দেশ ছাড়া বাকি সব দেশ টার্গেটেড শেষ সময়সীমার মধ্যে করোনাভাইরাস মুক্ত হয়ে গেছে। এই চারটির মধ্যে একটি আমরা।”

“সময়সীমা না কয়েকবার বাড়াল? আর বাড়ায় নি? কিন্তু এটা তো হবারই কথা। এইসব দেশে…”

নাহ্, বাড়ায় নি। শোন আগে। ঘটনা এখানে শুরু। নয়-দশ ঘন্টা আগে ডিক্লারেশন এসেছিল যে দুনিয়ার বাকি সব দেশ এই চারটি দেশের সাথে সবরকম যোগাযোগ বন্ধ করে দিচ্ছে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই গুজব ছড়িয়েছে যে, এসব দেশের পয়সাওয়ালা লোকদের অনেকেই অন্য দেশে চলে গেছে আর বাকিরাও চলে যাচ্ছে। এসব দেশের সাধারণ লোকের ভাগ্যে কী আছে কেউ জানে না। এ অবস্থায় গত কয়েক ঘণ্টা ধরে এ কয়টি দেশে লুটপাট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা আগুনের মতো ছড়াচ্ছে। আমাদের দেশেও একই অবস্থা। ভোররাত থেকেই ঢাকার অবস্থা বাজে। এখন মাথা ঠাণ্ডা করে খুব সাবধানে থাকতে হবে…”

 

ফোন লাইনটাও কেটে গেল, নেটওয়ার্ক পাচ্ছে না। পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে অস্থিরভাবে আসা যাওয়া করছে। আমার খুব পিপাসা পাচ্ছিল। খাবার টেবিলের জগ হাতে নিয়ে দেখি পানি নেই। রান্নাঘরে গিয়ে কলসিটাতে দেখলাম পানি নেই। ফ্রিজ খুলে দেখলাম পানি নেই। বেসিনের কল খুললাম, যদি অল্প একটু পানি পাওয়া যায়। এক ফোঁটা পানিও পড়ল না। তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে গেল।

  

আসলেই তৃষ্ণা পাচ্ছিল। মাথার কাছে বোতলের অবশিষ্ট পানিটুকু শেষ করে তখন থেকে বসেই আছি। বারান্দার কোনার টবে দেখছি আজই দুটো চারা মাটি থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। ওদের দেখে অস্বস্তিকর অনুভূতিটা কিছুটা ছাড় দিল। কী যে মায়াকাড়া শিশুগাছ দুটো! মনে হচ্ছে আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দুটি শিশু চোখভরা বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে এই রহস্যময় পৃথিবীর দিকে। চড়ুই আর শালিকদের সাথে আরো কিছু পাখি ডাকাডাকিতে যোগ দিয়েছে। ঠাণ্ডা মিষ্টি বাতাস বইছে।

এই পৃথিবীটা নিশ্চয় আমার এই করোনাকালের দুঃস্বপ্নের মতো হয়ে যাবে না।

 


তানভীরের ভাবতে ভালো লাগে, তিনি ভেবে চলেন। মাঝে মাঝে কিছু ভাবনাই তাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

sixteen − 15 =

Leave a comment
scroll to top