”তালাশ”-এর মরিয়মদের তবুও টিকে থাকতে হয়


তানজিনা তাবাস্‌সুম নোভা


শাহীন আখতারের লেখা তালাশ  বইটা পড়ে আমার মনে বিপরীত দুই ধরনের চিন্তা কাজ করছে।

১। এই বইটা আমি এত এত বছর ধরে না পড়ে শেলফে রেখে দিলাম কেমন করে?

২। যে সময়ে বইটা আমার হাতে এসেছিল, সে সময়ে না পড়ে এটা পড়ার জন্য এতগুলো বছর সময় নেওয়া আসলে ঠিকই হয়েছে। 

যে কোন ভালো বই পড়ার পরে হয়তো বেশিরভাগ পাঠকেরই আমার মত এই আফসোসটা হয়, ইশ্‌! আরো আগে কেন এই বইটা পড়লাম না! তালাশ  বইটা যখন আমাদের বাসায় আসে, তখন খুব সম্ভবত আমি সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। হাতের কাছে যা পাই, তা-ই পড়ে ফেলার একটা অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই আমার ছিল, কিন্তু তারপরেও এই বইটা কেন যেন আমার পড়া হয়ে ওঠে নি। পড়া হলো এই এতগুলো বছর বাদে এসে। পড়ে যথারীতি এতদিন বইটি না পড়ার জন্য যেমন আফসোস হচ্ছে, তেমনি মনে হচ্ছে সেই সময়ে এই বই পড়লে আমার আসলে শুধু পড়াটাই হতো, এই বই থেকে কোনো চিন্তার খোরাক তখন হয়তো নেওয়া সম্ভব হতো না।

তালাশ-এর পটভূমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। গল্পের কেন্দ্রে আছে মরিয়ম বা মেরী। একাত্তরের বীরাঙ্গনা মরিয়মের সূত্র ধরেই গল্পে আরো অজস্র চরিত্রের আগমন ঘটে। 

স্বাধীনতার ২৮ বছর পর তরুণ গবেষক বীরাঙ্গনাদের নিয়ে গবেষণায় নামে। সেভাবেই সে মরিয়মের খোঁজ পায়, আর সেই সাথে তার মতো আরো অনেকের গল্প জানার সুযোগ হয়।

ফুলতলি গ্রামের মরিয়ম ক্লাস টেনে পড়ার সময় এক অঘটন ঘটিয়ে বসে। এ কারণেই তাকে তার বাবা-মা ঢাকা শহরে পাঠিয়ে দেন, সাথে থাকে ছোট ভাই মন্টু। সেখানে মরিয়মের পরিচয় হয় আবেদের সাথে, সময়ের সাথে তাদের সম্পর্ক অনেকদূর গড়িয়েও যায়। কিন্তু ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর থেকে দেশের যে উত্তাল পরিস্থিতি, তাতে গা ভাসিয়ে আবেদ আর মরিয়মের খোঁজ রাখে না। ১৯৭১ এর ২৫শে মার্চের কয়েকদিন আগে মন্টু বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করে, কিন্তু মরিয়ম যায় না। ২৫শে মার্চের রাতটা পার হওয়ার পর রমিজ শেখ নামে একজনের সহযোগিতায় সে ঢাকা থেকে পালায়। বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়ে, অনেক বিপদ পাড়ি দিয়ে যখন সে তার গ্রাম থেকে মাত্র এক বা দুইদিনের দূরত্বে, তখন মরিয়ম পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে ধরা পড়ে। এরপরের কাহিনী অত্যাচার আর নির্যাতনের কাহিনী, মানুষ হয়ে মানুষকে ন্যূনতম মর্যাদাটুকু না দেওয়ার কাহিনী, যুদ্ধোত্তর দেশে মরিয়মের জীবন সংগ্রামের কাহিনী।  

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বীরাঙ্গনারা আর এক সত্যের মুখোমুখি হয়। তারা দেখতে পায় সমাজ, এমনকি তাদের নিজেদের পরিবারও তাদের গ্রহণ করতে রাজি হচ্ছে না। এই সময় মরিয়মের বার বার মনে পড়ে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অনুরাধার কথা, যে আগে থেকেই এই সত্য দেখতে পেয়েছিল, যে বলেছিল, যুদ্ধ শেষ হলে সে পাকিস্তানে চলে যেতে চায়। বিস্মিত মরিয়ম নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সে বলে,

“কোন দেশ? যে দেশ তোমার ওপর শত্রুর নির্যাতনকে নির্যাতন হিসেবে দেখবে না, দেখবে নিজের বেইজ্জতি হিসেবে, তারপর হয় আমাদের লুকিয়ে ফেলবে, না-হয় বেশ্যালয়ের দিকে ঠেলে দেবে—সেই দেশের প্রতি?”

তারপরও মরিয়ম টিকে থাকে। হার মেনে নিতে নিতেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেষ্টা করে।      

শাহীন আখতারের লেখা আমি এই প্রথম পড়লাম। পড়ার পর আমি এতটুকু বলতে পারি যে, আমি এরপর থেকে অবশ্যই ওনার বই খুঁজে খুঁজে পড়ব, অন্য প্রিয় লেখকদের বেলায় যা আমি করে থাকি। তাঁর গদ্য ঝরঝরে এবং স্বাদু। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠায় লেখার ধরনের সাথে খাপ খাওয়াতে কিছুটা সময় লাগলেও এর পরের পৃষ্ঠাগুলোতে কোনো সমস্যা হয় নি। 

শাহীন আখতারকে আমার বেশ আন্ডাররেটেড মনে হয়েছে। তাঁর লেখা নিয়ে তেমন আলোচনা কোথাও আমার চোখে পড়ে নি, পড়লে হয়তো আরো আগেই আমি তাঁর বই পড়া শুরু করতাম। আমি মনে করি, তাঁর লেখা নিয়ে আরো আলোচনা হওয়া উচিত। 

সবাইকে তালাশ  পড়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।   

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Leave a comment
scroll to top